শিক্ষা মূলক গল্প
Trending

অপরাধ চক্র (শিক্ষা মূলক গল্প) কাজী ফয়েজ আহমেদ

গত বেশকিছু দিন থেকে মনটা খুব অস্থির। কেনো?
তার উত্তর জানা নেই।
যা কিছু করছি অস্থির চিত্ত নিয়েই করছি।
খাওয়া;পড়া;পড়ানো;রাতজাগা ;এমনকি লেখালেখিও।
এ সময়ের সবচেয়ে দারুণ বিষয় কি জানেন?
আপনার অস্থিরতার কারণ হয়তো অনেকেই শুনতে বাধা দিবেনা।অথচ কোনো এক অদৃশ্য কারণে আপনি নিজেই বলতে পারবেননা বা বলতে চাইবেননা।
আপনাকে কেউ বাধা দেবে।
আমার সারাজীবনের শত্রু আমি খোদ নিজেই।
আমার লড়াইটা তাই আমার সাথেই।
আমি বিশ্বাস করিনা কেউ একজন আপনাকে ছেড়ে যায় বলে;কেউ একজন আপনাকে বুঝেনা বলে;কেউ একজন আপনাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় বলেই আপনি দুনিয়া থেকে আলগা হয়ে যান।
আপনি বরং তখনই আলগা হয়ে যান যখন আপনি নিজেই নিজের থেকে দূরে সরে যান।
আপনি যখন নিজেই নিজের কাছে অচেনা হয়ে যান।
কদিন থেকে একটা চক্রের কথা ভাবছি শুধু।
আব্দুর রহিমের আট বছরের মেয়েটা স্কুলে গিয়ে আর ফেরত আসেনি।মেয়ের শোকে আব্দুর রহিমের বউটা অসুস্থ হয়ে গেলো।আব্দুর রহিম পুলিশে অভিযোগ করতে গেলো।পুলিশ ভাবলো এইতো অবশেষে একখানা মুরগী পাওয়া গেলো।পুলিশ আব্দুর রহিমের কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকা দাবী করলো।গাড়ির তেল খরচ ;পুলিশের ডিউটি খরচ;লাঞ্চ খরচ ইত্যাদি হিসেব করে ওসি তার এস আই কে দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা চাইলো।আব্দুর রহিম গরীব মানুষ। ভ্যান চালক।এতো টাকা কোথায় পাবে।তবুও মেয়েটাকে যে খুঁজে পেতেই হবে।ছুটে স্থানীয় নেতার কাছে গেলো।নেতা ভাবলো এটাই সুযোগ। আব্দুর রহিমের ভিটে বাড়িটা নেতার বাড়ির ঠিক সামনে। পাঁচ শতক জায়গা জুড়ে একটা জোড়াতালি দেয়া ভাঙাচুরা ঘর দাঁড়িয়ে আছে একটা ডুপ্লেক্স বাড়ির সামনে। দৃশ্যটা কতইনা দৃষ্টি কটু!
নেতা মনে মনে ভাবলো এই সুযোগে হাতিয়ে নেয়া যাবে।তিনি আব্দুর রহিমের সামনে কান্না কান্না ভাব নিয়ে বললেন-
-এই পুলিশগুলোর কি একটুও দয়া মায়া নেই?আচ্ছা যা তুই চিন্তা করিসনা আমি সব দেখছি।তয় আমার মনে হয় তোর টাকাটা দেয়াই উচিৎ। টাকা নিয়ে তুই চিন্তা করিসনা। এতো ছোট একটা মেয়ে!কোথায় আছে?কি হালে আছে কে জানে?
আব্দুর রহিমের সামনে মেয়েটার মিস্টি মুখটা ভেসে উঠলো। সে হাউমাউ করে কেঁদে নেতার পা জড়িয়ে ধরলো।
-আপনি আমার মাইয়াটারে খুঁইজা আইন্যা দেন নেতা। আপনি যদি পুলিশকে একটু বলে দেন আমি মেয়েটারে পাইয়া যাবো।
নেতা মনে মনে ভাবলো-এইতো গরীব পায়ের তলে এসেছে।
মুখে বললো-
-আরে আব্দুর রহিম করছিস কি?আমার কি মনে নেই ভোটের সময়ে তুই আমার জন্য কতটা খেটেছিস?
সারা মহল্লার মানুষকে তুই একত্রিত করেছিস।আমার জন্য প্রতিপক্ষের মাথায় লাঠি মেরেছিস।তোর মেয়েকে খুঁজে বের করা আমার দায়িত্ব। আমি বিকেলেই একবার থানায় যাবো।তুই বরং এই কাগজটায় একটা টিপসই দিয়ে যা।
নেতা সিন্ধুক খুলে একটা কাগজ বের করে দিলেন।
আব্দুর রহিম একটু ভাবলো।
নেতা হেসে বললো-
-আরে তেমন কিছুনা।তুই তো জানিস পুলিশের কারবার করতে কত খরচ?তুই কিচ্ছু ভাবিসনা সব খরচই আমি করবো।তবুও একটা হিসেব রাখা আরকি।
আব্দুর রহিমের ভাববার মতো সময় ছিলোনা।সে কাগজে টিপসই দিয়ে দিলো।
নেতা বিকেলে থানায় গিয়ে ওসিকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলো।ওসি টাকাটা পকেটে পুরে মুচকি হাসলো।নেতার পাশে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকা আব্দুর রহিমের দিকে তাকিয়ে বললো-
-ভেবোনা রহিম;তোমার মেয়েকে ঠিক খুঁজে বের করে ফেলবো।তাছাড়া তুমি স্যারের লোক এটা আগে বললেই হতো।
নেতা রহিমকে নিয়ে থানা থেকে বের হওয়ার পর ওসি এস আই কে ডেকে দশ হাজার টাকা দিলো।
-এটা রাখো।
এস আই বললো-
-তাহলে স্যার স্কুল এড়িয়ায় গিয়ে কিডন্যাপিং স্পট দেখে আসতে হবে।হয়তো কোনো ক্লু পাওয়া যাবে।
ওসি কিছুটা ধমকের স্বরে বললো-
-আরে রাখো মিয়া;তোমার দেখি ডিউটির ভুত চেপে আছে ঘাড়ে।সবে তো পঞ্চাশ হাজার টাকা।তার থেকে আবার খরচ করে ফেললে চলবে নাকি?
আরও এক দুই দফা টাকা পকেটে আসতে দাও।
এস আই মনে মনে ভাবলো-বাহ গুরু।আপনি তো আমার দিল জিতে নিলেন।
আর এক দফাই শুধু বিশ হাজার টাকা যোগার করতে পারলো আব্দুর রহিম।তৃতীয় দফা আসা আগেই বাড়ির পাশের ধানের জমিতে মেয়েটার ক্ষত বিক্ষত লাশ পেলো।আব্দুর রহিমের দুনিয়াটা চোখের সামনে দোলে উঠলো। কিছুদিন বাদে আব্দুর রহিম নেতার দরবারে হাজির হলো।হাতজোড় করে জানালো-
সে আর এ গ্রামে থাকতে চায়না।যদি নেতা তার বাড়িটা কিনে নেন।নেতা মুচকি হেসে বললো-
-সে কী কথা। তুমি আমার কত আপনার লোক।ভোটের সময়…..
নেতা খেয়াল করলো আব্দুর রহিমের এসব কথায় কোনো মনোযোগ নেই।তাই আর কথা বাড়ালোনা।
সিন্ধুক খুলে বিশ হাজার টাকা আব্দুর রহিমের হাতে দিয়ে বললো-
-বাড়ি তো আগেই বিক্রি করে রেখেছো রহিম।আমি কিন্তু তোমায় ঠকাইনি।আমি চাইলে বাড়িটা ওই আগের দাম দিয়েই রেখে দিতে পারতাম। আমারও তো একটা ইনসাফ আছে।নাকি?এই নাও বিশ হাজার বাড়িয়ে দিলাম।তুমি সদ্যই মেয়েকে হারিয়েছো।তোমার মেয়েটার বয়সী আমারও তো একটা মেয়ে আছে। আমি তোমাকে ঠকাই কি করে?
এমন সময় বছর আটেকের একটা মেয়ে এসে দরোজায় দাঁড়ালো।
-বাবা;নাস্তা খাবে এসো।মা ডাকছে।
আব্দুর রহিম এক পলক ওদিকে চেয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো।
-আচ্ছা স্যার ;আমি এখন আসি। সকাল সকাল বেরুতে হবে আবার।
নেতা আব্দুর রহিমের হাত দুটো ধরে বললো-
-এসো তবে।গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছো বলে আমাদের ভুলে যেওনা যেনো।মাঝেমাঝে এসো।
আব্দুর রহিম মাথা নেড়ে সায় দিলো।কথা বলার শক্তি পাচ্ছিলোনা যেনো।টলতে টলতে কোনো রকমে নেতার বাড়ির গেটটা পার করলো।
থানার ওসির বাড়িতে শোকের মাতম চলছে।আজ চারদিন হলো ওসির তেরো বছরের মেয়েটি স্কুল থেকে ফেরেনি।বউয়ের ফোন পেয়েই ওসি ছুটে এলো বাড়িতে। কখন হলো;কি করে হলো কিছুই বুঝতে পারছেনা।কালক্ষেপণ না করে ওসি সাহেব এস আইকে আদেশ দিলেন যে করেই হউক মেয়েকে খুঁজে বের করতে।এসপি সাহেব;কমিশনার সাহেব খবর পেয়ে ছুটে এলেন।তারা শান্তনা দিলেন।
-এ সময়ে ধৈর্য্য হারাতে হয়না আকবর। যা করবা মাথা ঠান্ডা রেখে করবা।তুমি এক কাজ করো;যতদিন তোমার মেয়েকে খুঁজে না পাওয়া যাচ্ছে তোমাকে ছুটি দেয়া হলো।এই দুর্দিনে পরিবারের পাশে থাকা খুবই জরুরি।
ওসি আকবরের বুকটা ধক করে উঠলো। সে অসহায়ের চোখে কমিশনারের দিকে তাকালো।
কমিশনার বললো-
-তুমি কিচ্ছু ভেবোনা আকবর। আমি এস আইকে বলে দিচ্ছি।যা করার সে-ই করবে।তুমি শুধু এক ফাঁকে এসে একটা রিপোর্ট লিখিয়ে যেও।
ওসি সেদিন বিকেলেই থানায় গেলো ওরা কোনো খোঁজ পেলো কিনা জানার জন্য।
এস আই নাদিম চেয়ারে বসা ছিলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়ে বললো-
-আপনি তো জানেন স্যার এসব কেসে তদন্তের ক্ষেত্রে কত খরচ।আপনি নিজেদের লোক। আপনাকে আর কি বলবো স্যার?
ওসির নিজেকে আব্দুর রহিম মনে হলো।সে পকেট থেকে এক লাখ টাকার একটি বাণ্ডিল বের করে এস আইকে দিলো।এস আই মুচকি হেসে বললো-
-আপনি কিচ্ছু ভাববেননা স্যার। আমরা একশন নিচ্ছি।
ওসি টলতে টলতে থানা থেকে বেরিয়ে গেলো।
এ এস আই এগিয়ে এলে এস আই তার হাতে বিশ হাজার ধরিয়ে দিলো।এ এস আই বললো-
-তাহলে স্যার কাজে নেমে পড়ি?
এস আই মুচকি হেসে বললো-
-ধুর বোকা ;সবেতো এক লাখ এলো।
আরও দু এক দফা আগে আসুক।
আজ চতুর্থ দিনে তৃতীয় দফার টাকা নিয়ে ওসি বাড়ি থেকে বেরুবে এমন সময় খবর এলো-
-এস আই নাদিমের নেতৃত্বে একটি টীম ওসির মেয়েকে উদ্ধার করেছে।
ওসি মনে মনে ভাবলো-
-যাক অবশেষে নাদিম কাজটি করেছে।সে ছুটে থানায় গেলো। থানায় বারান্দায় ওসির মেয়ের মৃত লাশটিকে শুইয়ে রাখা হয়েছে।লাশটি ক্ষত বিক্ষত ছিলো।
ওসি কমিশনার বরাবর পদত্যাগ পত্রটি পাঠিয়ে দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়ে পরলো।এস আই নাদিম ওসির স্থলাভিষিক্ত হলো।
ওসি চলে যাওয়ার ঠিক একমাস বাদে নেতা ছুটতে ছুটতে থানায় এলো। ওসি নাদিম চেয়ারে বসা।নেতা প্রথমে পানি চাইলো।এ এস আই দীদারুল আলম এক গ্লাস ঠান্ডা জল দিলো।এ নিঃশ্বাসে জলটুকু খেয়ে নেতা একটা জোরে নিঃশ্বাস নিলো।
-স্যার আমার মেয়েটাকে বাঁচান।
হাউমাউ করে কেঁদে সে ওসির পা জড়িয়ে ধরলো।
ওসি নাদিম বললো-
-স্যার আপনি আমাদের এলাকার নেতা।আপনার জন্য নিশ্চয়ই কিছু করবো।আপনাদের আশ্রয়েই তো আমরা চাকুরীটি করে দু পয়সা কামিয়ে সংসারের একটু সুখের দেখা পাই। আপনি তো জানেন এসব কাজে তদন্ত করা কতটা কঠিন আর কতটা রিস্ক।আপনি কিছু খরচাপাতি রেখে যান আমরা দ্রুত একশন নিবো।
নেতা কথা বাড়ালোনা।কারণ সে এ প্রসেস আগে থেকেই জানতো।ভয়ে তার গলা শুকিয়ে আসছিলো।
সে পাঁচ লাখ টাকা ওসির হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
সে দুই দফা তিন দফার জন্য অপেক্ষা করতে পারছিলোনা।সে তার ডুপ্লেক্স বাড়ি সাথে আব্দুর রহিমের বাড়িটিও অপর এক নেতাকে লিখে দিয়ে বিশ লাখ টাকা নিলো।
পরদিন সকালে টাকাগুলো ওসির হাতে দিতে তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।ওসি বললো-
-কি যে করেন স্যার।আপনি কি মনে করেন আমরা আপনাদের ভালোবাসিনা?
সারারাত অভিযান চালিয়ে শেষে আপনার মেয়েকে উদ্ধার করেছি।তবে দুর্ভাগ্য বশত তাকে আমরা জীবিত পাইনি।আরও একটা দুঃসংবাদ হলো ক্রিমিনালদের কাউকেই ধরা যায়নি। তবে খুব দ্রুত ধরে ফেলবো আশা রাখছি।
নেতার চোখের সামনে দুনিয়াটা যেনো দোলে উঠলো।
সে সবকিছু অন্ধকার দেখছিলো।একজন কনস্টেবল এসে তাকে ধরে ফেললো।
সেদিন রাতে পাড়ার কুকুরগুলো বড্ড চেঁচামেচি করছিলো।সারারাত ধরে ঘেউঘেউ করে ওরা কি আনন্দ উল্লাস করছিলো?
কে জানে?
পরদিন সকালে নেতার বাড়িটি খালি পড়েছিলো।অবশ্য এ বাড়িটিতে নেতার আর কোনো অধিকারও ছিলোনা।
কেউ জানেনা নেতা কোথায় আছে বা কোথায় গেলো?
পাঠক ভাবতে পারেন ওসির কন্যা বা নেতার কন্যার অপহরণ ;ধর্ষণ ও হত্যা আমাদের আব্দুর রহিম করে থাকবে হয়তো।আপনারা ভাবুন যা খুশি।
যা ভেবে আনন্দ পান।তবে লেখক প্রতিহিংসা পরায়ণ নয়।প্রতিশোধে আনন্দ পাননা।অনেকেই হয়তো ভাববেন আব্দুর রহিমের মেয়েটার হত্যাকাণ্ডের পর উচিৎ শিক্ষা হয়েছে। লেখক ভাবছে ওসির মেয়ে বা নেতার আট বছরের শিশু মেয়েটার কি দোষ ছিলো।
কেনো আপনাদের চোখে আব্দুর রহিমের মেয়েটার জন্য জল আর ওসি ও নেতার মেয়ের জন্য তৃপ্তি?
জানি জবাব নেই।
এটাই চক্র।অপরাধ চক্র।
দিনশেষে রাতের কুকুর গুলোই জয়ী হয়ে যায়।
কুকুর গুলো কারা পোষে?
নেতারা আর তাদের খাবার জোগায় ওসি আকবর ও নাদিমরা।
ভালো থাকুন;সুস্থ থাকুন।ধন্যবাদ

Tags

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close