ভালোবাসার গল্প

জীবন যেখানে যেমন!( ভালোবাসার গল্প) মোর্শেদাা রুবী

জীবন যেখানে যেমনঃ
মোর্শেদা রূবীঃ
~~~~~
গত কয়েকটা দিন ধরেই কাজ করতে বেশ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তাবশীর। এমনিতে সারাদিন ঘরে ভারী পর্দা দেয়া থাকে বলে ঘরে নিজের মতো থাকতে তেমন সমস্যা হয়না কিন্তু রান্নাঘরে যাবার সময় বেশ জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ব্যপারটা এখন এমন অবস্খায় দাঁড়িয়েছে যে না যায় রওয়া, না যায় সওয়া।
ইরেশ ভাইয়ার আচরণ তাবশীরের কাছে বেশ দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে। সে রান্নাঘরে গেলেই এই লোক কোনো না কোনো কাজের ছুতোয় রান্নাঘরে উঁকি মারবে নতুবা এটা ওটা চাইবে।
তাবশীর সাধ্যমতো পর্দার মধ্যে থেকে তার ফরমায়েশগুলো পালনের চেষ্টা করে। নিজের আব্রু বজায় রেখে কাজের সুবিধার্থে একটা বড় সড় হিজাব বানিয়ে নিয়েছে সে। এটা হাঁটু পর্যন্ত ওকে কভার করে রাখে। কিন্তু মাঝেমধ্যেই ইরেশ ভাইয়ার কৌতুহল ভরা চাহনীর সামনে বেশ বিপন্ন বোধ করে ও। এই যেমন আজও তাবশীর যখন রুটি বানাচ্ছিলো তখন ইরেশ ভাইয়া রান্নাঘরে ঢুকে টুলটা টেনে নিয়ে দরোজা আগলে বসে গিয়ে বললেন-
-“তোমাদের কিভাবে কি হলো বললে না তো? পুরোটা তো আমার জানা হলো না…।”
তাবশীর অপর দিকে মুখ করে রুটি সেঁকছিলো। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে কিছুটা কর্কশ স্বরে বলে উঠলো-
-“এসব বলার মতো কিছুনা ভাইয়া। আমি আমার ব্যক্তিগত বিষয় জনে জনে বলে বেড়ানো পছন্দ করিনা। আর আপনি গরমের মধে বসে আছেন কেন, ঘরে গিয়ে বসুন প্লিজ!”
-“কি ব্যপার? তুমি কি আমার উপর ক্ষেপে আছো নাকি? এভাবে কথার উত্তর দিচ্ছো যে…?”
-“আমি এভাবেই কথা বলি।” বলে তাবশীর প্লেট বাটি চামচ সব কিছু শব্দ করে ঝনঝনিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলো। যেন সে খুব রেগে আছে। ইরেশ কিছুক্ষণ ওর কাজকর্ম দেখে উঠে ঘরে চলে গেলো। তাবশীর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সে জানে সে কোনো অন্যায় করেনি। পাক কালাম শরীফে বলা আছে, পরপুরুষের সাথে কথা বলার সময় কোমল স্বরে কথা না বলতে। তাতে যাদের মনে ব্যাধী আছে তাদের মনে কুমতলব দানা বাঁধতে পারে (সুরা আহযাব-৩২)! তাবশীর সেটাই এপ্লাই করেছে।
কাজ হয়েছে দেখে মনে মনে বললো- -“আলহামদুলিল্লাহ! “
কিন্তু একদিন খাবার টেবিলে মা আর ইউশার সামনে সে ফট করে বলে বসলো-“এজন্য আমি মেয়েদের দুচোখে দেখতে পারিনা। তোমার বড় বৌমা বলো কি ছোট বৌমা, দুইটাই এক জাত।ভালো করে কথা বলতে যেন এদের মুখ ব্যথা করে!”
সারিকা অবাক হয়ে বললেন-” ছোটজন আবার এরিমধ্যে কি করলো? “
-” কি আবার করবে! আমি যে তার ভাসুর হই সেকথা কি তার মাথায় ঢোকে ? গতকাল পানি চাইলাম প্রেসারের ঔষধটা খাবার জন্য অথচ সে আমাকে ধমক দিয়ে বলে, নিজেরটা নিয়ে খেতে পারেন না? মেইড সার্ভেন্ট মনে করেন নাকি আমাকে?”
ইউশা খেতে খেতে থমকে গেলো কথাটা শুনে। সারিকা তাবশীরের দিকে তাকালো। তাবশীর তখন পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে এমন কিছুই বলেনি। লোকটা এমন ডাহা মিথ্যা বলছে কি করে! তাবশীরের চোখে পানি এসে যাচ্ছিলো। সে দ্রুত নিজের ঘরে চলে গেলো।
রাতে ইঊশা ওর মুখ কালো দেখে হাত ধরে টেনে নিজের ঊরুর উপর বসালো-
-“কি হইসে কি, ক্লিয়ার করে বল তো? ভাইয়া এসব বললো কেন?”
তাবশীর মৃদুস্বরে বললো-” আমি জানি না উনি এভাবে মিথ্যা কেন বলছেন। আমি এমন কিছু বলিনি। তবে উনি অযথা আলগা খাতিরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি ওনাকে ইগনোর করছি মাত্র। এর বেশী কিছু না বিশ্বাস করো। “
-“হম….!” ঈউশাকে কিছুটা চিন্তিত মনে হলো। তাবশীর ওর মুখ তুলে ধরে বললো-
-“তুমি কি আমাকে অবিশ্বাস করছো?”
-“পাগল নাকি…! তোরে আমার চেয়ে বেশী কে চেনে ! ভাইয়াকে যেমন ছোটবেলা থেকে চিনি তোকেও তো তাই..! ষোলো বছর ধরে আমাদের ফ্রেন্ডশীপ ছিলো, ছল করেও তোরে কোনোদিন বেকায়দায় ছুঁতে পারি নাই। এখন স্বামী হয়েছি বলে না কপাল খুলে গেছে…!”
হেসে বললো ঈউশা।আসলে ও প্রসঙ্গ বদলানোর চেষ্টা করছে বুঝতে পারলো তাবশীর। নিজের ভাই সম্পর্কে এসব শুনতে হয়তো ওর ভালো লাগছেনা।
তাবশীর কপট রাগে ওর মুখটা আলতো ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে বললো
-‘যাহ্,ফাজলামী বন্ধ করো! আমি এখন কি করবো সেটা বলো ? আমার এই রোজকার টেনশন আর ভালো লাগেনা। এতো গায়ে পড়া স্বভাব হয়েছে ওনার যে বলার মতো না। আর মিথ্যা যে কিভাবে বলে….!”
-” কি যে করি। (কপালে ভাঁজ বাড়লো ইউশার) বললো-‘এরমধ্যে কাল আমাকে আবার দেশে যেতে হবে। ভাইয়া অবশ্য সামনের মাসের তেইশ তারিখে চলে যাবে। এই ক’টা দিন একটু ম্যানেজ করতে পারবি না? ভাইয়ার মুখ একটু আলগা কিন্তু অতটা খারাপ না যতটা তুই ভাবছিস। সে ভালো করেই জানে তুই এখন তার ভাইয়ের বৌ। সম্পর্কের এই লিমিটেশন তো তাকে মানতেই হবে।” ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো ইউশা। ওর কপালে চিন্তার রেখা স্পষ্ট। ওকে এমন অসহায়ের মতো ভাবতে দেখে তাবশীরের কাছে একটু খারাপই লাগলো। বেচারা ভাইকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছে অথচ পুরোপুরি পারছেও না। ভাইকে অতটা খারাপ ভাবতেও বাঁধছে ওর। তাবশীর হঠাৎ ওর মাথাটাকে আঁকড়ে ধরে বুকের সাথে চেপে ধরে মৃদু স্বরে বললো-
-” আচ্ছা,বাদ দাও। এ্যাতো ভেবোনা। আই ক্যান টেক কেয়ার অফ মাই সেলফ ইনশাআল্লাহ। তাছাড়া আম্মুতো আছেই। তুমি তোমার মতো যাও। টেনশন করে নিজের শরীর খারাপ করার দরকার নাই! ফিরবে কবে?’
ঈউশা জড়ানো কন্ঠে বললো- ” পরশু….! আমি তোকে ফোন দেবো বারবার।”
তাবশীর ওর কপালে চুমু খেয়ে বললো-
বারবার ফোন দেয়া লাগবেনা! তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ।” আচমকা ওর মনে হলো ওর কোমড়ের কাছে ঈউশার হাতের চাপ বাড়ছে। তাবশীর আবছা হেসে ওর ইচ্ছেকে সম্মান জানালো।

সকালের নাস্তা সেরে খুব ভোরেই রওনা দিলো ইউশা গ্রামের উদ্দেশ্যে। যাবার আগে মা’কে বারবার বলে দিলো -“তাবশীরের দিকে খেয়াল রেখো মা…!”
ঈউশা চলে যাবে জেনে তাবশীর একদিনের রান্না আগে থেকেই করে রেখেছিলো যেন সারাদিন রান্নাঘরে গুটুর গুটুর করতে না হয়। তাই ইউশা চলে যাবার পর দিনের বাকিটা সময় নিজের ঘরে নামাজ পড়ে আর বই পড়ে কাটালো সে। বুয়া তার কাজকর্ম সেরে তিনটার দিকে বিদায় নিলে সারিকাও নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। তাবশীর নিজেও খাওয়া দাওয়া সেরে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়লো। এমন সময় ঈউশার ফোন এলে ওকে আশ্বস্ত করে নিজের সারাদিনের কাজের ফিরিস্তি শোনালো। ঈঊশার সাথে কথা শেষ করতেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসলো ওর। এমনিতেই রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি তার উপর ফজরের নামাজ পড়ে যাওবা একটু শুয়েছে! ঈউশার জন্য তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে হয়েছে।
দরোজায় টুকটুক শব্দ শুনে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো । চোখ মেলে চারপাশ তাকালো। ঘরের ভেতরটা আবছা অন্ধকার। তারমানে রোদ পড়ে গেছে।
আসরের ওয়াক্ত কি চলে গেলো নাকি…ভাবলো তাবশীর !
মোবাইলটা টেনে নিয়ে সময় দেখলো।
বিকেল পাঁচটার ওপরে বাজে। বেশ অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে তাহলে। দরজার টুকটুক শব্দটা এবার ঠকঠক শব্দে রুপান্তরিত হলো। তাবশীর ধীরে সুস্থে বিছানা ছেড়ে নেমে চুলগুলো সামলে হিজাবটা টেনে নিয়ে মাথায় বাঁধলো।
তারপর আস্তে করে বললো-
-“কে….?”
ইরেশ ভাইয়ার ব্যস্ত কন্ঠের ডাক শুনে চমকে গেলো তাবশীর। তিনি মোটামুটি জোরেই বলে উঠলেন-“আরে দরজা খোলো মেয়ে..! আম্মু সেই কখন থেকে তোমাকে ডাকছেন!”
তাবশীর জিভ কেটে দ্রুত উঠে দরজার লকের দিকে হাত বাড়িয়েও থমকে গেলো।
তারপর মনে মনে পড়ে নিলো-
“আউযুবিকালিমা তিল্লাহিত্তাম্মাহ মিন শাররী মা খ্বলাক..!” এটা বিপদ মুক্তির দোয়া। দোয়া পড়ে দরোজা খুলে বেরোতে গেলো তাবশীর কিন্তু ইরেশকে দরোজা পুরোটা আগলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পিছাতে বাধ্য হলো।
ইরেশ মুচকি হেসে বললো-” আমার কিছু জিনিস ইমার্জেন্সী লাগবে বলে আম্মুকে মার্কেটে পাঠিয়েছি। আম্মু আবার আমাকে বলে গেলো তোমার দিকে লক্ষ্য রাখতে। তাই ভাবলাম একটু দেখে আসি! তুমি তো আবার আম্মুর নাম না নিলে দরোজা খুলতে না তাই…..!” বলে ইরেশ দুহাত কোমড়ে দিয়ে দাঁড়ালো। ঠোঁটে নির্লজ্জের হাসি।
তাবশীর পিছিয়ে খাটের সামনে এসে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। সে নিজের চেহারায় কোনোরকম ভয়ের চিহ্ন ফুটতে দিলোনা। ঠান্ডা স্বরে বললো-“দেখুন বড় ভাইয়া, আমি আপনার ছোট ভাইয়ের বৌ তারমানে আপনার ছোট বোনও। এমন কোনো আচরন করবেন না যার জন্য সারাজীবন আপনাকে ঈউশার কাছে ছোট হয়ে থাকতে হয়। আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করতে চাই। আর আপনি দেখেছেন আমি বাইরের লোকদের সামনে যাই না তারপরেও আপনি বারবার….!”
-“এসব প্যাচাল রাখো আর আমার কথা শোনো। আমার হাতে সময় কম। তোমার শ্বাশুড়ী তোমাকে ফেলে যেতে চাচ্ছিলো না। তাকে রীতিমত জোর করেই পাঠিয়েছি আমার ওগুলো লাগবে বলে। জানি সে দ্রুত আসার চেষ্টা করবে বাট যেটা আনতে দিয়েছি সেটা বসুন্ধরা ছাড়া পাবেনা অতএব তার খোঁজাখুঁজির সময়টাকে আমি কাজে লাগাতে পারি…!”
-“আপনি কেন এসেছেন সেটা বলে বিদায় হন।আমার আসর নামাজের ওয়াক্ত যাচ্ছে! “
-“রাখো ওসব বুজরুকী। কত ধার্মিক দেখলাম। যাহোক, যা বলতে এসেছি সেটাই বলি….আমি তোমার কাছে দশ মিনিট সময় চাই। জাষ্ট টেন মিনিটস। একান্তে নিভৃতে….! আই থিঙ্ক ইউ ক্যান আন্ডারষ্ট্যান্ড। আই ওয়ান্ট ইউ জাষ্ট ফর…..!” বলতে বলতে থেমে গেলো ইরেশ কারন তাবশীর আচমকা উবু হয়ে খাটের নিচ থেকে একটা বটি বের করে হাতে নিয়েছে।
তাবশীর বটিটা উঁচিয়ে ধরে শান্ত স্বরে বললো-“জাষ্ট গেট আউট অফ হিয়ার…! যদি কোপ খেতে না চাস। গেট লষ্ট!”
ইরেশ তাতে বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে মুচকি হেসে বললো-“সো সিনেমাটিক। কিন্তু বাবু, তুমি আমাকে কোপালে তুমি নিজে কি আস্ত থাকবে? পুলিশ এসে তোমাকেই ধরে থানায় নিয়ে যাবে। আর ঈউশার সাথে ঘর সংসার আজই শেষ হয়ে যাবে। গোটা সমাজ জানবে তুমি ভাসুরকে কুপিয়েছো। তোমার মায়ের কীর্তি কাহিনী আমি শুনেছি। পাবলিককে বোঝাতে বেশী কষ্ট হবেনা। তারচে এতো ঝামেলায় না গিয়ে এটা দেখো। পকেট থেকে একটা ছবি বের করে তাবশীরের দিকে ছুঁড়ে দিলে ছবিটা সেটা তাবশীরের পায়ের কাছে পড়লো। তাবশীর সেদিকে তাকালো না। সে সতর্ক দৃষ্টিতে ইরেশের দিকেই তাকিয়ে আছে।ইরেশ হেসে বললো-
-“ওটা তোমার বোন তানিশার সাথে আমার কৈশোরের একটা বিশেষ মুহূর্তের ছবি। সেসময় ওর সাথে আমার ফ্রেন্ডশীপের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে তোমার। তারই কিছু ক্লিপিংস। অবশ্য তোমার আপত্তি থাকলে তানির হাজবেন্ড বা শ্বাশুড়ীকে এসব দেখাবোনা….!”
-” তোর সাথে কথা বলতে আমার রুচি হচ্ছেনা। শোন্, তুই যে মানুষ না জানোয়ার সেটা বোঝার পরপরই আমি আমার মতো সতর্ক হয়ে গিয়েছি। আর ঐসব ছবি তোরটা তোর কাছেই রাখ। কোনো কিছুর বিনিময়েই তুই আমাকে বোঝাতে আসবিনা। তোর মতো সস্তা নয় আমার সম্মান যে সামান্য হুমকিতে মুষড়ে পড়বে। ঐ ছবি নিয়ে তুই যা ইচ্ছে করগে….!”
-“বলো কি? তোমার বোনের বাঁশ হয়ে যাবে…!”
-” তোর দ্বারা আমার বোনের ততটুকুই ক্ষতি হবে যতটুকু আল্লাহ চাইবেন। মানের চেয়ে জান বেশী না!
অবশ্য তোর মতো জানোয়ারের পক্ষে এটা বোঝা কঠিন কারন তোর তো মান সম্মান বলে কিছু নাই। আমার বোনের ভাগ্যে যা আছে তা হবে। ওপরে আল্লাহ আছে, আমি সেই আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছি তারপর আমি নিজের মতো করে তৈরী হয়েছি। এই যে বটিটা দেখছিস তা বেডরুমে এনে রেখেছি তোর মতো কুকুর এ বাড়ীতে আছে বলে আর ঐ যে ওপরে ওটা কি দেখতে পাচ্ছিস?”
ইরেশ আড়চোখে দেখলো, বাল্বের নিচে একটা সিসি ক্যামেরা ফিট করা রয়েছে।
তাবশীর বলে চললো-“পুলিশ বা তোর ভাই কিংবা তোর মা। সবাই দেখবে কে কাকে কেন আঘাত করেছে। তাই তোর দিবাস্বপ্ন দেখা বন্ধ কর। মনে রাখিস, একটা মেয়ের কাছে তার প্রানের চেয়ে দামী তার সম্মান। তুই আমার সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলবি আর আমি মুখ বুঁজে বসে থাকবো এটা ভাবলি কি করে?”
ইরেশ সি সি ক্যামেরা দেখে কিছৃটা থমকে গেলো। ইতোমধ্যে তাবশীরের চোখ পানিতে ভরে গেছে। সে কান্নাভেজা কন্ঠে বললো-” এরি মধ্যে ভুলে গেলি যে কিছুদিন আগেই তোর বাপ মরেছে? কবরে নামার সাহসটুকু পাস নাই কুলাঙ্গার কোথাকার। আসছিস একটা মেয়ের অসহায় অবস্থার সুযোগ নিতে? আরে, ঘরের এক সিসি ক্যামেরা দেখে ঘাবড়ে গেলি আর তোর দুই কাঁধে যে দুই সিসি ক্যামেরা তোর রব তোর জন্মের সময় সাথে দিয়ে পাঠিয়েছে তার খবর নাই তোর? কোনোদিন কি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবি না? নিজের সংসার তো টিকাইতে পারলিনা তুই আবার কিসের স্বামী? জন্মদাতা হয়েও বাপ হতে পারলিনা তোর মতো কুলাঙ্গারকে ভয় পাবার কি আছে। তুই তো এমনিতেই আধা মরা। এখন আমি তোরে কোপাইলে দুই ঘন্টা পরেই কবরে গিয়ে ঢুকবি। আমার কি হবে সেটা না ভেবে সময় নষ্ট না করে দুই ঘন্টা পরে কবরে গিয়ে কি করবি সেটা ভাব, কাজে দেবে। তোর মতো অমানুষকে তো……!”
বলে তাবশীর হাত উঁচু করতেই ইরেশ ছিটকে পেছনে সরে গিয়ে প্রায় চিৎকার করে বললো-“আরে আরে আরে….থামো থামো..! আমি তো তোমাকে কিছু বলিনি এখনো! তুমি কেন আমাকে এ্যাটাক করছো? ” ইরেশের স্বর এবার কিছুটা অন্যরকম শোনালো তাবশীরের কানে। সে কিছুটা হলেও দমে গেছে বলে মনে হলো ওর।
তাবশীর প্রায় বাড়ী ফাটিয়ে চিৎকার করে বললো -“তুই বাইর হ এখান থেকে…..! ‘
ইরেশের কি মনে হলো কে জানে, সে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। তাবশীর এগিয়ে গিয়ে বিকট এক ‘দড়াম’ শব্দে দরোজা লাগিয়ে দিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। ওর সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে। আল্লাহ সহায়,নইলে আজ কি যে হতো কে জানে!”
এর পনের মিনিট পরেই সারিকা এলেন। বেল বাজার শব্দ পেয়েই তাবশীর সচকিত হয়ে উঠে দু চোখ মুছে কান পেতে রইলো। সারিকার কন্ঠ পেয়েই সে বেরিয়ে এলো। ওকে দেখে সারিকা হেসে এগিয়ে গেলেন-“ইস্, ঘুমিয়ে চোখ মুখের কি অবস্থা করেছো ! চোখ এতো লাল কেন মা…?”
তাবশীর মাথা নাড়লো-“কিছু না মা! আপনি বিকেলের নাস্তায় কি খাবেন ?”
-“না, বিকেলের নাস্তা বানাতে হবেনা। আমি কিছু স্ন্যাকস নিয়ে এসেছি সেগুলোই ওভেনে গরম করে নিয়ো। তোমার ইরেশ ভাইয়া কোথায়?”
তাবশীর কোনো জবাব দিলোনা। মিনিট খানেক পরে ইরেশকে দেখা গেলো চোরের মতো মুখ করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে।
সারিকা ওকে দেখে বললেন-” কি এক জিনিসের নাম দিয়েছিস। সারা মার্কেট খুঁজে পেলাম না নইলে আমার কেনাকাটা তো দশমিনিটেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো। ইরেশ আড়চোখে তাবশীরকে দেখলো।
শক্ত পাথরের মতো মুখ। সে মিনমিন করে বললো-“মা, আমি কাল সকালে চলে যাবো!”
-“কোথায়…?” হতভম্ব হয়ে বললেন সারিকা।
-“হোটেলে। আর দিন পনেরো বাংলাদেশে আছি। একটু নিজের মতো করে কাটাতে চাই।”
-“কেন এখানে কি নিজের মতো করে কাটাতে পারছিস না? বাড়ী থাকতে তুই হোটেলে যাবি….!” সারিকা থেমে গেলেন। কারন ওদের কথার মাঝখানেই তাবশীর নিজের ঘরে চলে গেলো। সারিকা কিছু আন্দাজ করার চেষ্টা করলেন। তার অনুপস্থিতিতে কিছু হলো না তো তাবশীরের সাথে? তাবশীর কি ইরেশকে কোনো কটু কথা শুনিয়েছে? নইলে ছেলে হঠাৎ চলে যাবার জন্য পাগল হয়েছে কেন!
সারিকা ছেলের হাত ধরে ঘরে এসে বললেন-“কি হয়েছে রে? হঠাৎ হোটেলে উঠবি কেন তুই? তাবশীর কিছু বলেছে তোকে?”
ইরেশ নিজেও জানেনা ওর এমন হচ্ছে কেন।তাবশীরের ঐ কথাটা বুকে গিয়ে লেগেছে, সংসার ধরে রাখতে পারিসনা তুই কিসের স্বামী,জন্ম দিয়েও বাপ হতে পারলিনা তুই কিসের পুরুষ…! আচমকা বাপ্পীর কথা মনে হলো। তাকে কবরে নামানোর সময় ওর পা দুটো ঠকঠক করে কাঁপছিলো। ওর নিজেরো কি কোনোদিন কবরে যেতে হবে?’ মায়ের ডাকে ওর এলোমেলো ভাবনার জাল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো।
ইরেশ বললো-
-“না মা। আমাকে যেতেই হবে। মাঝেমধ্যে এসে তোমার সাথে দেখা করে যাবো।”
-“এবার কতদিন পরে এলি। আবার আসার আগে দেখবি আমিই মরে গেছি। লাশ দাফন করতে আসবি তখন …?” ইরেশ মনে মনে কিছুটা কেঁপে উঠলো ‘লাশ আর দাফন’ শব্দটা শুনে। এমন তো কখনো হয়না। আজ কেন হচ্ছে। খুব ভয় হচ্ছে ওর। তাবশীর মেয়েটা কি জাদু জানে? ওর কথাগুলো কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারবার।
মা ওর হাত চেপে ধরে বললেন-“না,কোনো হোটেল ফোটেলে যাওয়া চলবেনা তোর! “
ইরেশ কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেলো।ওর মাথাটা খুব ব্যথা করছে। আচ্ছা,তাবশীর কি সব বলে দেবে ইউশাকে? মাও বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে কারন ঘরের সিসি ক্যামেরাতে সব রিকর্ড করা। আজব এরা…, ঘরের ভেতর কেউ সিসি ক্যামেরা লাগায়?ইউশা কেন লাগিয়েছে কে জানে?
ক্লান্ত হাতে সিসি ক্যামরাটা হতে সুতোর বাঁধন আলগা করলো তাবশীর। মাদ্রাসার জন্য লাগানো সিসি ক্যামেরাগুলোর মধ্যে এটি একটি। নষ্ট বলে ঘরেই পড়েছিলো। ইউশা চলে যাবার পর কি মনে হতে সিসি ক্যামেরাটা বাল্বের পয়েন্টের সাথে এমনভাবে বেঁধে রেখেছিলো তাবশীর যেন দেখলে মনে হয় ঘরে ক্যামেরা লাগানো। অপরাধীরা যে ভীরু হয় ইরেশ আরেকবার তা প্রমান করে দিলো। সে বোকার মতো ওর কথা বিশ্বাস করে কিছুটা হলেও ভড়কে গেছে। তাবশীর ক্যামেরাটা একটা ড্রয়ারে রেখে দিলো।
এমন সময় মাগরিবের আযান হতেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করে অযু করতে চলে গেলো সে।

রাত প্রায় তিনটা। ঈউশা নেই বলে খাওয়া দাওয়া সেরে আজ তাড়াতাড়িই শুতে চলে এসেছে তাবশীর। দিনে একটু ঘুমিয়েছিলো বলেই কিনা কে জানে। রাতে দুচোখের পাতা এক করতে পারলো না। আজকাল এক অভ্যাস হয়েছে ঈউশার গায়ের গন্ধ না পেলে ঘুম আসেনা। বাধ্য হয়ে উঠে গিয়ে ওর একটা শার্ট নিয়ে মুখের কাছে ধরে তাতে নাক ডুবাতেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসলো।
রাত তিনটার দিকে দরোজায় টুকটুক শব্দে ঘুম ছুটে গেলো ওর। বুকের ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করছে। এতো রাতে কে এলো? তাবশীর কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে বসে রইলো। আড়চোখে সোফার নিচের দিকে তাকালো। বটিটা ওভাবেই পড়ে আছে। কি ভেবে রান্নাঘরে রাখেনি। আছে যখন থাক। ইউশা জিজ্ঞেস করলে একটা কিছু বলে দিলেই হবে।বেচারাকে তার ভাইয়ের কারনে অপদস্থ করতে চায়না সে।
আবারো টুকটুক শব্দ।
ইউশার শার্টটা এবার বুকের সাথে চেপে ধরলো তাবশীর। আচমকা দরাজ গলার শব্দে বিষম চমকে উঠলো।
-“তাবশীর, দরজা খোল্…!” এটা তো ঈউশার কন্ঠ ! প্রায় উড়ে গিয়ে দরোজা খুলে নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলোনা তাবশীর।
রুদ্ধশ্বাসে বললো-“তুমি এতো রাতে?”
-” কাজ শেষ তাই এক মুহূর্ত দেরী না করে চলে এলাম। রাত পোহাবার ধৈর্য্যটুকু রাখতে পারছিলাম না। তুই বড় জ্বালাস রে তুসী!”
তাবশীর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লো ঈঊশার বুকে। দুপা ছড়িয়ে শক্ত করে দাঁড়ানো ছিলো বলে পড়তে গিয়েও টাল সামলে নিলো ইউশা।নইলে দুজনেই হুমড়ি খেয়ে পড়তো। তাবশীরের চোখের পানিতে ভিজে যাচ্ছো ওর কাঁধের কাছের শার্ট।
ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করলো ইউশা-‘কোনো সমস্যা হয়েছে?”
তাবশীর মাথা ঝাঁকালো।
নিজের ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে দৃশ্যটা দেখছিলো ইরেশ। লম্বা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে পর্দাটা ছেড়ে দিলো সে। আজ প্রথমবারের মতো মনে হলো জীবনের সবচে বড় আনন্দটা থেকেই বঞ্চিত সে। নারী শরীর ভোগ করার চেয়ে তাদের মনের খোরাক হওয়া যে কতটা আনন্দের তা তার মতো পোড়াকপালেরা জানবে কিভাবে।
একটা শেষ চেষ্টা কি করবে?
একটু ভাবলো ইরেশ।
ক্লান্ত হাতে মোবাইল বের করলো।
বিশেষ একটা নম্বর টিপে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো –
-“হ্যালো….কনক?…..আ’ম স্যরি। আমাকে কি আরেকবার ক্ষমা করা যায়? আই মেক শিওর….আর এরকম হবেনা। ট্রাষ্ট মি….প্লিজ! আই ওয়ানা কাম ব্যাক!”
কিছুক্ষণ নিরবতা তারপর হালকা স্বরে বললো ইরেশ- ” থ্যাংকস আ লট! আমার মেয়েরা কি করে? ওদের বোলো তাদের বাবা নেক্সট স্যাটারডেতে আসছে! বাই! সি ইউ….উইথ আ টাইট হাগ।”
(সমাপ্ত)

Tags

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close