শিক্ষা মূলক গল্প

ইয়ে করে বিয়ে ( শিক্ষা মূলক গল্প ) মোর্শেদা হোসেন রুবী

ওরা তিন বান্ধবী।
রুবি,রোজী,দুলি।স্কুল জীবন থেকে ওদের বন্ধুত্ব।স্কুলের চৌকাঠ পেরিয়ে ওরা কলেজে যখন ঢুকলো তখন ওদের মনে হলো তিনজনেই বেশ বড় হয়ে গেছে।কারন ওরা এখন কলেজে পড়ে।
তিনজনের মধ্যেই বড় বড় একটা ভাব।
কেবল বড়ত্বের অভাব এই যা…!
বড় হয়েছি, এই মানসিকতা আসার কিছু কারনও আছে।দুলি যে কোচিং সেন্টারে পড়ে সেখানকার এক ছেলে ঝিলামের সাথে ওর বেশ খুনসুটি হতে দেখা যায়।
রোজী আর রুবী তা তৃষ্ণার্ত চোখে চেয়ে চেয়ে দেখতো।
আহা! প্রেম,বড় মধুর।
দুলি ঝিলামের খুনসুটি প্রেমে গড়াতে সময় নিলো দুমাস।
এক বিকেলে দুলি বান্ধবীদের টা টা বাই বাই বলে ঝিলামের সাথে চলে গেলো।
রুবী আর রোজীর মন খারাপ।
ওদের এখনো কোনো বিশেষ বন্ধু জুটলো না।
রোজী ধনী পরিবারের মেয়ে সে তুলনায় রুবী মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা।
ছেলেপেলেরা রুবীর চেয়ে রোজীকে ঘাটাতো বেশী।
যার ফলশ্রুতিতে ইন্টারের দুটো বছরের মধ্যে রোজীর প্রেমিকের সংখ্যা দাঁড়ালো এক হালির ওপরে।
এর মধ্যে একজন বিবাহিতও আছে।
রুবী একটু চালাক গোছের।
প্রেম করে সময় নষ্ট করার পাত্রী সে নয়।তার এমবিশন হলো ভালো লেখাপড়া করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হলোও তাই।
ঐদিকে কালক্রমে রোজীর প্রেমিকের কোয়ান্টিটি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো।
একটা যায় আরেকটা আসে।
অনার্ম ক্লাস পর্যন্ত রোজী মোটামুটি প্রেমের উপর বিরাট ডিগ্রী অর্জন করে ফেললো।
গত কিছুদিন আগেও ওর শেষ প্রেমিকের সাথে ব্রেকাপ হয়ে গেলো।
এরই মধ্যে রোজীর মা রোজীর বিয়ের জন্য পাত্র দেখতে শুরু করলেন।
রোজী ছটফটিয়ে উঠলো।
তার হাতে তো কোনো প্রেমিক পুরুষ নেই যাদের কাউকে সে বিয়ের জন্য চাপ দেবে।
আবার মায়ের পছন্দ করা অপরিচিত ছেলেকেও সে বিয়ে করবেনা।
এ ব্যপারে তার বক্তব্য পরিস্কার।
জেনে শুনে প্রেম করে বিয়ে করবো,একে অন্যকে বুঝবো,জানবো,বোঝাপড়া হবে তারপর সংসার জীবনে পা রাখবো।সে সংসার হবে সুখের উদ্যান।
চিনিনা, জানিনা কাকে না কাকে বিয়ে করবো!
দুর! আজকাল সেটেল ম্যারেজের কোনো দাম আছে নাকি!বিয়ে হবে তবে ইয়ে করে।ইয়ে ছাড়া বিয়ের কোনো মজা নাই।
একদিকে বাড়ী থেকে বিয়ের চাপ আরেকদিকে নতুন প্রেমিকের খোঁজে দিশেহারা রোজী।
এরিমধ্যে রুবী আর দুলির বিয়ে হয়ে গেলো।
রোজীর দিশেহারা ভাব আরো বাড়লো।
এক মন বিষন্ন করা বিকেলে রোজীর মন উৎফুল্ল করে দিয়ে পরিচয় হলো ‘নীল’ নামের এক ছেলের।
রোজীর পোশাক আশাকেই সে বুঝে নিয়েছে রোজী উচ্চবিত্ত ঘরের মেয়ে।দুজনের বন্ধুত্ব বাংলা সিনেমার মতো অতি শর্ট টাইমে মহানপ্রেমে রূপান্তরিত হলো।
রোজী তার বাসায় যুদ্ধ ঘোষণা করলো!
সে নীল ‘কে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবেনা।
নীলও রোজীকে বিয়ে করতে দুইপায়ে খাড়া।
এই বাজারে চাকরী বাকরী ছাড়া সে চলবে কি করে।রোজীকে বিয়ে করতে পারলে অর্ধেক রাজ্য সহ রাজকন্যা।
কিন্তু হায়! রোজীর মা চালচুলোহীন নীলের সাথে রোজীর বিয়েতে মত দিলেন না।
একদিন রোজী নীলের সাথে পালিয়ে গেলো।
বিয়ে করে বাবা মা’কে ফোন করে জানালো,মেনে নিলে আসবো নইলে না।
নীলের আশা ছিলো,বাপমা আদরের মেয়েকে ফেলতে পারবেনা।
কিন্তু না!
রোজীর জেদী, দাম্ভিক বাবা -মা নীলকে মেনে নিলেন না।
শুরু হলো রোজীর কঠিন জীবন।
নীল ভেবেছিলো বাবামায়ের আদরের ননীর পুতুলকে তারা বেশিদিন বাইরে ফেলে রাখবেন না।
কিন্তু জেদের কাছে ভালোবাসা হেরে গেলো।
রোজীকে মেনে নেয়নি ওর বাবা মা।
প্রথম কিছুদিন প্রেমপূর্ণ সম্পর্ক জিইয়ে রাখলেও রাজ্যবিহীন রাজকন্যা পেয়ে হতাশায় ফুঁসে ওঠা নীল সন্ধানে নামে নতুন কিছুর।
নীলের ভাঙ্গাচোরা গ্রামের বাড়ীতে রোজীকে ফেলে রেখে নীল শহরে গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াতে লাগলো।
ঐ দিকে কোনোদিনও ডিজিটাল গ্যাস বার্নার না জ্বালানো রোজী লম্বা লোহার পাইপ দিয়ে উবু হয়ে ফুঁকে ফুঁকে মাটির চুলায় আগুন ধরাতে শিখে গেলো।
শিখে নিলো উঠান ঝাড়ু দেয়া আর গোবর দিয়ে ঘর লেপা।
প্রেমের বিয়ে বলে কথা।
বোঝাপড়ার বিয়ে।
অনার্স পড়ুয়া রোজীকে দেখলে ফাইভ পাশ গেঁয়োবধুর সাথে পার্থক্য করা দুষ্কর হয়ে পড়ে ।
দুবছরের কঠিন সংগ্রাম শেষে অবশেষে নীলকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঢাকায় এলো রোজী।
একটা টিনের ছাপড়া ভাড়া নিলো নীল।বহু কষ্টে চলতে শুরু করে রোজীর সংসার।
অনার্সে ভালো রেজাল্ট না করতে পারার কারনে রোজীর কোনো ভালো চাকরীও জুটলো না।
ফলে টিউশনিই ভরসা।সারাদিন টিউশনি করে আর বাড়ী ফিরে ভাঙ্গাচোরা সংসারের ঘানি টানা রোজীকে জীবন্ত কঙ্কাল বললে অত্যুক্তি হয়না।
এরই মধ্যে রোজী গর্ভধারন করে বসলো।
নীল দ্রুত তাকে হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়।
আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে সেদিন রোজী ভারমুক্ত হয়ে টলতে টলতে বাড়ী ফিরলো।
এক দুপুরে চড়ারোদে সস্তা থ্রীপিস পরিহিতা কঙ্কালসার রোজীকে দেখলো তার মা।
বুকের ভেতর কষ্টগুলো দলা পাকিয়ে উঠে তার।
মেয়েকে খুঁজে বের করলেন তিনি ।
বাড়ীর একটা ফ্ল্যাট খালি করে তাতে নীলের হাত পা ধরে তাকে উঠতে বলা হলো ।
একটু দেরীতে হলেও অবশেষে নীল পেলো রাজ্য সহ রাজকন্যা।
রোজী কি পেলো তা আজও জানা যায়নি।
এমন রোজীর সংখ্যা অসংখ্য।
ইয়ে করে বিয়ের হিড়িক ঘরে ঘরে।
কারন প্রেমের মড়া তো নাকি জলে ডোবেনা।

Tags

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close