ভালোবাসার গল্প

কোন এক বসন্তে (ভালোবাসার গল্প) নাদিয়া আক্তার

চোখ বরাবর আমার সামনে যে লোকটা ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম হচ্ছে অর্পণ। তাকে আমি ডাকতাম অর্পণ ভাই বলে। সে হয়ত আমাকে খেয়াল করেনি এখন পর্যন্ত। বয়সে সে ছিল আমার ৮ বছরের বড়। পড়ালেখার তাগিদেই সে আমাদের বাড়িতে থাকত। যৌবনকালে সবে মাত্র পা দিয়েছি। বান্ধবীদের মাঝে তখন চলত নতুন নতুন প্রেমের গল্প।
ওদের থেকেই সেসব গল্প শুনতে শুনতে, নতুন নতুন অনুভূতি তে জর্জরিত হচ্ছি, ঠিক তখনই বসন্তের প্রথম সদ্য ফোঁটা ফুলের মতো সে আসে আমার জীবনে । শীতের চাদরের মতো তার জন্য গড়ে ওঠা অনুভূতি গুলো আমাকে জড়িয়ে নিচ্ছিল প্রতিনিয়ত। বৃষ্টির পানির মতো সেই অনুভূতিতে আমি ভিজতাম প্রতিদিন । আমার রাত গুলো কাটত তার ভাবনায়, ঘুম ভাঙত তার স্বপ্ন দেখে। হয়ত ভালোবাসা কী তখনও ঠিকমত বুঝে উঠতে পারিনি কিন্তু যে অনুভূতিতে আমি আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছিলাম, সেটা তখন আমার কাছে ভালোবাসারই নাম পেয়েছিল। বসন্ত শেষ হলেও আমার জীবন থেকে তখনও বসন্ত যায় নি। তার চোখের দিকে তাকিয়ে কখনও কথা বলার সাহস হতো না আমার। তার গাঢ় কালো চোখের মনির দিকে তাকালে মনে হতো আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছি। মনের কথা বলে উঠার সাহস কখনই হয়ে উঠে নি আমার। গোপনে গোপনে তাকে ভালোবেসে, সেই অনুভূতি টুকু নিয়ে আমি দীর্ঘ ২ বছর পাড় করে দিয়েছিলাম। কিন্তু মুখ ফুঁটে বলার সাহস হয়নি যে আমি তাকে মনে প্রাণে কতটা অনুভব করি । লজ্জায় যেন আমি মাটিতে মিশে যেতাম তার সামনে গেলে। কিন্তু একদিন রাতে!! সাহস করে আমি ছুটে গিয়েছিলাম তার ঘরে। ঘরের আলো তখন নেভানো ছিল। বাইরে থেকে আলো আসছিল হালকা। দরজা বন্ধ করে আছড়ে পড়েছিলাম তার দু পায়ের উপর। লজ্জা ভুলে, সিক্ত চোখে, আকুল কন্ঠে তাকে বলেছিলাম
” অর্পণ ভাই আমি যে আর পারছিনা। দাদুকে বলে বিয়েটা ভাঙার ব্যবস্থা করো।দাদু নিশ্চয়ই তোমার কথা শুনবে।”
অর্পণ ভাই তখন আমার দুবাহু চেপে ধরে দাঁড় করাল আমাকে।
” অন্তিকা কী করছিস তুই এতো রাতে!! কেউ দেখলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। আজ বাদে কাল তোর বিয়ে। কুৎসা রটে যাবে যে।”
আমার মনে যা চলছিল তখন আমি সব ভুলে গিয়েছিলাম। লজ্জা, কেলেঙ্কারির ভয়, মান সম্মান কিছুই তখন আমার মাথায় ছিল না। আমি শুধু জানতাম তাকে ছাড়া আমার বাঁচা প্রায় অসম্ভব। আমি শুধু কেঁদে যাচ্ছিলাম। জানিনা সে কী দেখেছিল সেদিন আমার ভেজা চোখে। আমার নত মুখটা উঁচু করে চোখের পানি টুকু মুছে দিল। আমি আলো আঁধারের মাঝে শুধু তার অবয়ব টা দেখতে পাচ্ছিলাম আর অনুভব করতে পারছিলাম তার সিক্ত ওষ্ঠদ্বয়ের স্পর্শ। আমি নিজেই নিজের হাত খামচে ধরেছিলাম সেদিন। অন্য সময় হলে হয়ত আমি নির্ঘাত ফাঁসির দড়িতে ঝুলে পড়তাম কিন্তু সেদিন!!!! তারপর ফিসফিস করে অর্পণ ভাই বলল
” আবদ্ধ ঘরের এইটুকু স্মৃতি নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে সারাজীবন আলাদা আলাদা ভাবে।”
আমি তার বুকে আছড়ে পরেছিলাম সে কথা শুনে।
কেঁদে তার বুক, শার্ট ভিজিয়েছিলাম।
সারারাত আমি ফ্লোরে বসে তার কাঁধে মাথা রেখে কেঁদেছি। সে শুধু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। চুলের ভাঁজে ভাঁজে আমি তার হাতের আঙুলের স্পর্শ অনুভব করতে পারছিলাম। সে আমাকে বুঝিয়ে ছিল দাদু যা করছে ঠিকই করছে, বাড়ির সবাই কত খুশি। আমিও নাকি বিয়ে করে সেখানে সুখেই থাকব। আরও কত কিছু। তখন আমার মনে হচ্ছিল তাকে বলতে
” তুমি স্বার্থপর। তুমি আমার কথা না ভেবে অন্যের কথা ভাবছ কী করে এখন?? আমার শুধু তোমাকে চাই। তুমি বুঝেও কেন অবুঝ হচ্ছ।”
কিন্তু বলতে পারিনি।
ঘড়িতে তখন চার টা বাজে। তন্দ্রায় একটু চোখ লেগে এসেছিল। কিন্তু তার ডাকে আমি চোখ খুলি।
” একটু পরেই ভোর হবে। নিজের ঘরে যা। “
আমি আর কিছু না বলে বেরিয়ে আসি। নিজের ঘরের দরজার কাছে এসে আবার দৌঁড়ে যাই তার কাছে। হাত দুটো ধরে বলেছিলাম
” একটু চেষ্টা করে দেখো।”
সে একটু হেসেছিল। সেই হাসির মানে আমি কখনই বুঝতে পারিনি। কিন্তু প্রায় মধ্যরাতে আমার ঘুম ভাঙে তার সেই হাসি মাখা মুখটা দেখে। তখন আমার মনে ঝড় চলে। ১৫ দিনের মাথায় আমার বিয়ে হয়ে যায়। বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার আগে আমি তার ঘরে একবার গিয়েছিলাম, তখন সে ঘরে ছিল না। আমি তা জেনেই গিয়েছিলাম। সে থাকলে আমি যেতাম না। কারণ তার সামনে গেলে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারতাম না।
টেবিলের উপর এলোমেলো হয়ে তার বই খাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। আমার খোপা থেকে একটা গোলাপ নিয়ে তার একটা বইয়ে আমি রেখে দিয়েছিলাম। কেন করেছিলাম কাজ টা জানিনা। কিসের আশায়, কিসের প্রতিক্ষায় কে জানে।
সেদিন ই আমি তাকে শেষ বারের মতো দেখেছিলাম। তারপর শুনেছিলাম সে নাকি বিদেশে চলে গেছে। আমিও সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।কিন্তু তাকে কখনই ভুলিনি। তার নাম টা আমার জীবন থেকে কখনই মুছে নি, আর সেটা যেন গভীর ভাবে আমার সাথে সবসময় জড়িয়ে থাকে তাই নিজের ছেলের নাম ও রেখেছি অর্পণ । আজ দীর্ঘ ১০ বছর পর আমি তাকে দেখলাম। এরপর আর কখনো দেখব কিনা জানিনা। তার পাশে এক সুদর্শন নারীকে দেখতে পাচ্ছি, যার হাত তার হাতের মুঠোয় আবদ্ধ ছিল। হয়ত তার বউ। বুকের ভেতর একটা শান্ত ঝড় শুরু হয়ে গেল যা অশান্ততে রূপ নিতে বেশি সময় লাগবে না। আমার ঘোর ভাঙল শুভ্রর ডাকে। আমার স্বামী, যার সাথে এতো দীর্ঘ পথ আমি পাড়ি দিয়েছি। যার ভালোবাসা আমাকে সবসময় তার কাছে বেঁধে রেখেছে। অর্পণ ভাইকে না পাওয়ার কষ্টে যে হাসি আমি ভুলে গিয়েছিলাম, সে হাসি ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি হাসি দিয়ে তার এক হাত আঁকড়ে ধরলাম। আরেক হাত আমার ছেলে ধরে আছে। আমরা হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরতে লাগলাম। আমি একবার পেছন ফিরে তাকালাম শেষ বারের মত সেই মুখটা দেখতে, যা আজও আমার হৃদয়ের অংশ বিশেষ জুড়ে থাকে। বারবার একটা প্রশ্ন মাথায় হানা দিচ্ছিল
” তার ও কি মনে পড়ে আমাকে??”

ভিড়ের মধ্য থেকেই আড় চোখে আমি অন্তিকাকে দেখলাম, হয়ত অন্তিকা বুঝতে পারেনি। ও যে আমাকে দেখে হতভম্ব হয়ে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল, তা সবই আমার চোখে ধরা পড়েছে। ওর চোখ মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম ওর মনের ঝড় টা। এতক্ষণে ও অতীতে বিচরণও করে ফেলেছে আমার মতো আমি নিশ্চিত । আগের থেকে আরও সুন্দর হয়ে গেছে মেয়েটা। যে মেয়ে একটা সময় ওড়না টাও ঠিকমতো নিতে পারত না, সে এখন দিব্বি শাড়ি পড়ে হেঁটে যাচ্ছে স্বামীর হাত ধরে। হয়তো আমাকে দেখে ধিক্কার দিচ্ছে মনে মনে বারবার । কিন্তু সে জানে না আমার হৃদয়ের সব টা জুড়ে এখনো তার বসবাস। কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকে না। মানুষের অনেক চাহিদা থাকে। জীবন চলার পথে একজন সাথীর প্রয়োজন হয়। হয়তো তাদের আমরা মনের সেই জায়গা টা দিতে পারি না তারপরও আমাদের একটা সঙ্গী প্রয়োজন নিঃসঙ্গতা দূর করতে আর সেই প্রয়োজন পূরণ করেছে অনুপ্রভা। যার জন্য আমার মনে আলাদা একটা জায়গা আছে। যে জানে আমার মনের গহীনে এখনও কার আনাগোনা চলে কিন্তু সে কখনই এটা নিয়ে কথা বলে নি, না চেয়েছে কখনও জবাবদিহি। সে তা মেনে নিয়েই আমাকে তার সাথী হিসেবে গ্রহণ করেছে। এই মুহূর্তে অনুপ্রভা শক্ত করে আমার হাত ধরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চাহনি এখন অনেক কিছুই ব্যক্ত করছে। আমি হালকা একটু হাসি দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করলাম আমি ঠিক আছি। চোখের আড়ালে চলে গেল অন্তিকা। তারপর রিক্সায় উঠে বাড়ি ফিরে এলাম আমরা। অন্তিকার হাসি ছিল আমার কাছে একটা পরিচিত গানের মত। যা সারাদিন আমার কানে বাজতে থাকত। যা শুনে কখনই আমি ক্লান্ত হতাম না। বরং আমি বারবার শুনতে চাইতাম সেই গান। ওর চোখ দুটো ছিল গভীর সমুদ্র। যাতে বার বার ডুব দিতে ইচ্ছে হতো। ইচ্ছে করত সেই সমুদ্রের গভীরতায় বারবার হারিয়ে যেতে। ওর কথা গুলো ছিল কবিতার মত। বার বার পড়তে ইচ্ছে হতো। ও ছিল আমার কাছে একটা খোলা বই আর অমিমাংশিত সমাধান। যা বার বার সমাধান করে আমি মিলাতে পারতাম না। কিন্তু বারবার সমাধান করতে ইচ্ছে হতো।
আলমারি খুলে সেই বই টা বের করলাম যার ভাঁজে এখনও রয়েছে শুকিয়ে যাওয়া সেই গোলাপ টা, যার মাঝে এখনও আমি অন্তিকার অস্তিত্ব খুঁজে পাই। যার মলিন ঘ্রাণে এখনও আমি অতীতে ফিরে যাই।তার প্রথম আর শেষ স্মৃতি এটা আমার কাছে। সেদিন অন্তিকা যে আমার ঘরে ঢুকেছিল, আড়াল থেকে আমি তাকে দেখেছি। ও গোলাপ টা বইয়ের ভাঁজে গুঁজে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। বিছানার উপর রাখা আমার সাদা শার্ট টা বুকে আগলে ধরে রাখল।
আমার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তখন। সেদিন আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল শেষ বারের মতো তাকে জড়িয়ে ধরতে বুকের মাঝে। হয়ত এতে একটু হলেও আমার বুকের জ্বলা কমত। কিন্তু এতে হয়তো অন্তিকার বুকে যে ঝড়ের আগুন চলছিল, সেটা দ্বিগুণ হারে বেড়ে যেত। পরে আমি শার্ট টা ধরে দেখলাম। ওর চোখের পানিতে সেটা ভিজে রয়েছে। ওর ঠোঁটের লাল লিপস্টিক লেগে আছে তাতে ।অন্তিকা হয়তো সেদিন আমাকে ভীতু, স্বার্থপরের উপাধি দিয়ে চলে গিয়েছিল। কাপুরুষ ও ভাবতে পারে। ও যে ভালোবাসা ভিক্ষা চেয়েছিল কিন্তু আমি যে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। সে উপাধি নিয়েই আমি জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছি। হয়তো অন্তিকা বুঝতেও পারেনি সে দিন আমার ঠোঁট দ্বয় সিক্ত কেন ছিল। সেদিন সে শুধু চোখের পানিতে ভিজেনি, ভিজেছিলাম আমিও। সে রাতের স্মৃতি টুকু এখনও চোখ বুজলে স্পষ্ট ভেসে ওঠে আমার মনে। তখন ছাইদানি তে জমে থাকা সিগারেটের অর্ধেক অংশ গুলো জানান দিয়ে যায় আমার দেহ কতখানি জ্বলেপুড়ে শেষ হচ্ছে। বুকের ভেতর কবর দেওয়ার সেই না বলা কথাটা
একবার তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে ইচ্ছে করে
” ভালোবাসি “।
কিন্তু আর কখনও বলা হবে না , এই নির্মম সত্য নিয়েই প্রতিদিন কেটে যায় আমার। আর কেটে যাবে বাকি জীবন টা….. স্মৃতি গুলো সাথে নিয়ে। অনুপ্রভা চায়ের কাপ নিয়ে পাশে দাঁড়াল। ওর ঠোঁটে হালকা হাসি। চায়ের কাপ এক হাতে নিয়ে আরেক হাতে ওকে জড়িয়ে সামনের বিশাল আকাশের দিকে চোখ রাখলাম। পাখিরা নীড়ে ফিরছে। আকাশ রক্তিম বর্ণ। সূর্য টা ডুবার পথে আর আমি!!! অতীতে বিচরণের শুরুর পথে। অণুপ্রভা আমার কাঁধে মাথা রাখল। আমি আরেকবার ডুব দিলাম অতীতের পাতায়।

Tags
Back to top button
Close
Close