শিক্ষা মূলক গল্প

নিষিদ্ধ পল্লী (শিক্ষা মূলক গল্প)নুসরাত মাহীন

বিছানার উপর নগ্ন দেহটা পরে আছে। সাদা ধবধবে বিছানার চাদরটায় ছোপ ছোপ রক্তে ভরা। উঠে বসার সামান্য শক্তি নাই শরীরের প্রচন্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছি।
আবারো নরপশুটা শরীরের উপর ঝাঁপিয়ে পরলো। উহু আর না ছাড়েন প্লিজ ব্যথা লাগছে।
–এই চুপ আর একটা ও শব্দ করবি না টাকা খরচ করছি ছাড়ার জন্য নাকি! কষ্ট সহ্য করতে না পেরে কখন যে সেন্সলেশ হয়ে পরেছি নিজেও জানিনা। চোখ খুলে চারিদিকে ভালোভাবে তাকিয়ে নিজেকে আবিস্কার করলাম মেডিকেলের জরুরী বিভাগের গণরুমে।
অনেক রোগি ভরা রুমটার ভিতরে। তাই দেখে আমি নাম দিয়েছি গণরুম। বেডে, ফ্লোরে অসংখ্য রোগি হাঁটার জায়গাটুকু ও নাই।
সবাই আমার দিকে কেমন নোংরা দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে কি সব বাজে বাজে কথা বলছে আমাকে নিয়ে।আমার চোখ আটকে গেলো ছাব্বিশ নাম্বার বেডে থাকা রোগিটাকে দেখতে আসা ষাট বছরের বুইড়া বেডার দিকে। খাবার দেখলে কুকুরের যেমন জিব্বাহ বের হয়ে যায় আমাকে দেখেও লোকটার জিব্বাহ বের হয়ে গেছে। আর জিব্বাহটা সে নাড়াচ্ছে। পান চাবাইয়া ৩২ পাটি দাঁত বের করে ব্যঙ্গ করে হাসতেছে। লোকটার হাসি দেখে মনে হয় চিড়িয়াখানার বানর মানুষ দেখলে যেমন ভেংচি কেটে দাঁত বের করে বসে থাকে ওনিও বিশ্রী দাঁতগুলো বের করে বসে আছেন।
একজন নার্স খুব বাজে ভাষায় গালাগালি করে গেলো। সে আমাকে ইনঞ্জেকশন দেবেনা আমাকে স্পর্শ করতে তার গা ঘিনঘিন করেছে। আমাদের দেখলে নাকি অমঙ্গল হয়। ওয়ার্ড বয়কে ডেকে ইনঞ্জকশন দেয়ালো।
আমাদের দেখলে তোদের ঘৃণা লাগে আমরা যদি না থাকতাম প্রতিদিন হাজার হাজার মেয়ে ধর্ষণের স্বীকার হতো। তাদের কে ধর্ষিতার খাতায় নাম লেখাতে হতো। আরে আমরা কি ইচ্ছা করে এই পেশায় এসেছি নাকি! আমরা এসেছি পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে। এতে আমাদের দোষ কোথায়..?
আজ যদি আমাদের স্থানে কোন মডেল, অভিনেত্রী, নাইকারা থাকতো তাহলে তো আর তাদের শরীর স্পর্শ করতে ঘৃণা লাগতো না উল্টো তাদের সাথে মাখো মাখো হয়ে ছবি তুলতেন ফেসবুকের ওয়ালে ছবিটা রাখার জন্য। যাতে তারা রাতারাতি ফেমাস হতে পারে। আবার গর্ব করে পোস্ট করে বলতে পারে আমার মত কজনের সৌভাগ্য হয় নায়িকাদের সাথে ফটো তোলার।
অথচ ওদের স্ক্যান্ডেল দেখে কাস্টমারদের জিভে জল এসে যায় আমাদের মত পতিতাদের উপর হায়নার মত ঝাঁপিয়ে পরে। তারপর রাতভর আমাদের উপর নির্যাতন করে।
কি আশ্চর্যের বিষয় ওসব মডেল, অভিনেত্রী, নাইকাদের নামের আগে লেখা থাকে সেলিব্রেটি, স্টার, আইকন, ক্রাশ আর আমাদের নামের আগে লেখা থাকে বেশ্যা। আমরা যদি বেশ্যা হয় উরা তাহলে উচ্চমানের বেশ্যা।
আমাদের দেখলে নাকি সবার যাত্রা অশুভ হয়, অমঙ্গল হয় ওসব উচ্চমানের বেশ্যাদের দেখলে তোদের অমঙ্গল হয় না। আজকাল তো রেওয়াজ হয়ে গেছে বড় বড় সেলিব্রেটিদের দিয়ে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, শপিংমল, দোকানপাটের উদ্বোধনে ওদের দিয়ে ফিতা না কাটালে হয় না। আমাদের দেখলে অমঙ্গল আর ওদের দেখলে তোদের মঙ্গল হয়।
আমাদের শরীর দেখে শুধু আমাদের কাস্টমাররা আর ওদের শরীর দেখে কোটি কোটি মানুষ। আমাদের কে ঘৃণা না করে ওসব উচ্চমানের পতিতাদের ঘৃণা করেন যারা উপরে উঠার জন্য, ক্যারিয়ার ধরে রাখার জন্য সেচ্ছায় নিজেদের দেহ বিলিয়ে বেরায়।
আমরা হলাম নিষিদ্ধ তাই আমরা যেখানে থাকি সেই জায়গাটার নাম নিষিদ্ধপল্লী।
আমার নাম তনু সদ্য পতিতালয় পতিতা হিসাবে নাম লিখেয়েছি। বাবা নেই আমার যখন চার বছর বয়স বাবা কাজের জন্য দুবাই চলে যায়। প্রথম প্রথম যোগাযোগ রাখলেও পরে আর কোন খোঁজ খবর রাখে না। নানা, মামারা দুই বছর বাবার জন্য অপেক্ষা করে কিন্তু বাবার কোন খোঁজ পায়না। নানা-নানি মাকে আবার বিয়ে দেয়। মায়ের নতুন সংসার, নতুন বাবা ভালোই ছিলো। প্রথম প্রথম আমাকে অনেক ভালো বাসতো কিন্তু মায়ের যখন একটা ছেলে সন্তান হয় নতুন বাবার ও পরিবর্তন হতে লাগলো আমাকে আর আগের মতো দেখতে পারেনা। আমি হয়ে গেলাম উটকো ঝামেলা। নিজের সন্তান রেখে পরের সন্তানকে কেন সে পালবে…? এই নিয়ে মায়ের সাথে প্রায়ই বাবার সাথে ঝগড়া হতো।
আমি শিশু থেকে কৈশোরে পা দিলাম। নতুন বাবা শহরে ভালো স্কুলে ভর্তি করার নাম করে
শহরে নিয়ে আসলো। নতুন স্কুলে ভর্তি হব দেখে খুশিতে ছিলাম তবে সেই খুশি বেশিক্ষণ ছিলোনা। যখন নতুন বাবা কেমন অদ্ভুত একটা জায়গায় নিয়ে আসলো।
পুরো এলাকাটা অপরিস্কার আর নোংরায় ভরা ।
গলির মুখে ছোট্ট একটি বাজার।
বাজারের মধ্যে দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম দোকান গুলোতে একটা গান বাজছিলো
” বন্ধু তুই লোকাল বাস বন্ধু তুই লোকাল বাস। আদর কইরা ঘরে তোলোস ঘাড় ধইরা নামাস। বন্ধু তুই লোকাল বাস।””
আমাকে দেখে সবাই কেমন ভাবে যেন তাকাচ্ছিলো। গলির ভিতরে বেশ কিছু মেয়েরা ছেলেদের গায়ের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ তো আবার জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মেয়েগুলো অনেক সেঁজেগুজে আছে। ওখানকার ঘরগুলো ছোট ছোট আঁধা পাকা টিনের আবার কিছু ঘর পুরাতন দালানের। নতুন বাবা বলেছিলো এখানে তার ফুফাতো বোন থাকে। এক রাত এখানে থাকতে হবে। এর পরে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়ে স্কুল হোস্টেলে রেখে যাবে। বাবা মাকে নিয়ে প্রতি মাসে একবার এসে দেখে যাবে।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম বাবারে একটা লোক আর মহিলা অনেকগুলা টাকা দিছিলো। বাবা খুব খুশি হাইসা হাইসা জিব্বায় আঙুল ভিজিয়ে টাকাগুলা গুনতে ছিলো।
আমারে এখানে রাইখা বাবা ওই যে গেল আর আসেনি। বাবায় যাবার সময় বইলা গেছে মার্কেটে যাচ্ছে আমার জন্য বই খাতা, নতুন ব্যাগ, জামা কাপড় কিনতে। রাত পোহাইয়া সকাল হইলো এরপর বিকাল আবার রাত কিন্তু নতুন বাবা তো আর আসলোনা।
পরে জানলাম নতুন বাবা আমারে দালালের কাছে বিক্রি করে দিয়ে গেছে। যেখানে বিক্রি করে গেছেন এইটা হইলো নিষিদ্ধপল্লী। এখানে যে একবার ঢোকে সে আর কখনো বের হতে পারেনা।
এই নিষিদ্ধ পল্লীর লিডার হইলো ঐ মহিলা যে বাবারে টাকা দিছিলো ওনার নাম অনামিকা।
আমাকে নতুন ভাবে নতুন রুপে সাজাতে শুরু করলো আমার নাম লেখানো হলো পতিতাদের দলে।যাদেরকে এক কথায় বেশ্যা বলে।।
আমি যেই রুমে থাকি আমার সাথে আরো দু’জন থাকে এক জন হলো তানিয়া আপু অন্যজন মুন্নি খালা।
আমি এখন মুন্নি খালার আন্ডারে। উনি আমাকে ট্রেনিং দিচ্ছে এখানের কি কাজ করা লাগবে, কিভাবে কাষ্টমারদের মন রঞ্জন করতে হবে। মুন্নি খালার কাছ থেকে জানছি নতুন বাবা এখানে চড়া দামে বিক্রি করে দিয়া গেছে আমাকে।
এই নিষিদ্ধ পল্লীতে কেউ নিজের ইচ্ছাতে আসেনি সবাই আমার মত পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে এসেছে।
সবাই সুন্দরের পূজারি যে পতিতা যত বেশি সুন্দর তার রেট বেশি চাহিদাও তত বেশি।
কেউ দালালের খপ্পরে পরে, কাউকে স্বামী এসে বিক্রি করে দিয়ে গেছে, কাউকে পাচারকারী বিক্রি করে দিয়ে গেছে। কেউবা প্রেমিকের প্রতারণার স্বীকার। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে বের করে এনে এখানে বিক্রি করে দিয়ে গেছে, অনেকে পেটের ক্ষুধায় অভাবের তারোনায় এই পেশায় নাম লিখেয়েছে। তানিয়া আপুর মা নেই ছোড দুই ভাই-বোন আছে। বাবা বিয়ে করে আলাদা থাকে উনাদের কোন খোঁজ খবর নেয় না ভাই-বোনের মুখে দুবেলে খাবার তুলে দেবার জন্য বাধ্য এই পেশায় নাম লিখিয়েছে। মুন্নি খালারে এখানে নিয়ে আসছে উনার স্বামী। তারপর দালাদের কাছে নিজের বিক্রি করে দিয়েছে।
পতিতাদের জীবন এতটাই কষ্টের যা মুখে বলা যায়না। একটা অভিশপ্ত জীবন। ওরা টাকার বিনিময়ে সুখ বিক্রি করে। এখানে যে সকল কন্যা শিশু জন্মনেয় বড় হলে এদেরকেও পতিতাদের দলে নাম লেখাতে হয়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে অসুখ বিসুখ লেগে থাকে। ফার্মেসি থেকে ঔষধ কিনতে গেলে সাধারণ মানুষের কাছে যে দামে মেডিসিন বিক্রয় করে তার থেকে দ্বিগুণ দামে এদের কাছে ঔষধ বিক্রয় করে। শুধু ঔষধ না সব জিনিস চড়া দামে বিক্রি করে।
একদিন কাষ্টমার না পেলে না খেয়ে থাকতে হয়। কারন এদের ইনকাম করে দালালদের দিতে হয়, পতিতাদের লিডারকে দিতে হয়, পুলিশদের, এলাকার মস্তানদের ও দিতে হয়, ঘর ভাড়া, খাবারের খরচ দেবার পর অবশিষ্ট কিছুই থাকে না।
সমাজের মানুষরা আমাদের ঘৃণার চোখে দেখে। আমাদের প্রতি কারো বিন্দুতম সহানুভূতি নেই।
বেঁচে থাকতেও আমাদের কষ্ট ঘৃণিতো জীবন বহন করতে হয়। মৃত্যুর পরেও আমাদের মাটি হয় না, না হয় আমাদের জানাজা না হয় দাফন। মরার পরে কোন হুজুর আমাদের জানাজা পড়ায় না। আমাদেরকে কোন রকম গোছল করিয়ে নদীর পাড়ে মাটি চাপা দেওয়া হয় কারো কারো লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
আচ্ছা আমরা তো পাপ কাজ করি তাই সমাজের মানুষ আমাদের ঘৃণা করে কিন্তু এই ভদ্র সমাজের ভদ্র পুরুষ মানুষগুলো যারা আমাদের কাস্টমার দিনের পর দিন আমাদেরকে ব্যবহার করে তাদের যৌন চাহিদা পুরণ করছে কইইই ঐ সব পুরুষদের কে তো এই সমাজের মানুষেরা ঘৃণা করে না। আমাদের সাথে সাথে তাঁরাও সমান অপরাধী। কারণ তারা না থাকলে আজকে আমরা পতিতা হতে পারতাম না। তাদেরকে কেনো শাস্তি দেওয়া হয় না..????
ভূপেন হাজারিকার একটা গান আছে মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু।
এই গানটা শুধু আমাদের জন্য গানেই আমাদের জন্য কারো সহানুভূতি হয়না।
জন্মযেনো আমাদের আজন্মের পাপ।
****সমাপ্ত *****

গল্পঃনিষিদ্ধ_পল্লী

লেখঃনুসরাত_মাহিন

Tags

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close