বাংলা গল্প
Trending

হারিয়ে খুঁজি (বাংলা গল্প)মোর্শেদা হোসেন রুবী

Story Highlights

  • ভালোবাসারগল্প

আজ রাফিজের বাসররাত।
দ্বিতীয়বারের মতো এই ক্ষণটি তার জীবনে এলো।
লোকজন বউ রেখে বিদায় হয়েছে বহুক্ষণ হয়েছে।সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ক্লান্তিতে ঢলে পড়েছে সবাই।বিয়ে বাড়ীর উৎসব শেষে ঘুমে ঢলে পড়েছে বাড়িটি।ঘুম নেই শুধু রাফিজের চোখে।সে বারান্দায় বসে একমনে সিগারেট টেনে যাচ্ছে।একটার পর একটা।এটা নিয়ে পাঁচটা হলো।সিগারেট ধরাচ্ছে আর পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছে।বেতের টেবিলের উপর রাখা এ্যাসট্রেটা ভরে গেছে ছাই আর পোড়া সিগারেটের টুকরো দিয়ে।পুরো বারান্দাটা সিগারেটের উৎকট গন্ধে ভরে আছে।
একটু আগেও ঘরের ভেতর থেকে টাটকা বেলী ফুলের ঘ্রান ভেসে আসছিলো কিন্তু এখন আর তা আসছেনা।বরং বেলিফুল আর সিগারেটের গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।একটা অদ্ভুত গন্ধ তৈরী হয়েছে।
‘খুট’ করে শব্দ হলো।
পেছনে নতুন বৌ এসে দাঁড়িয়েছে নিঃশব্দে।
রাফিজ টের পেলো তবু ঘাড় ফেরালো না।এক মনে সিগারেট টানতে লাগলো।তনুকা এগিয়ে গিয়ে রাফিজের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।রাফিজ সিগারেটের শেষাংশ এ্যাসট্রেতে গুঁজতে গিয়ে চোখ পড়লো তনুকার মেরুন রঙা বেনারসীর উপর!
সে মুখ ফিরিয়ে নিলো!
কর্কশ স্বরে বললো -“এখানে কি?”
-“আপনার কি মন খারাপ?”
-“তাতে তোমার কি?”রাফিজ সিগারেট প্যাকেট খুলে ষষ্ঠ সিগারেটটা হাতে নিতে গেলে সেখানে তনুকার হাত এসে পড়লো! রাফিজ কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো।তনুকা রাফিজের কঠিন দৃষ্টি উপেক্ষা করে মুচকি হাসলো-
-“আর খাবেন না প্লিজ।এতোটা নিকোটিন একসাথে শরীরের ভেতর ঢোকালে তো অসুস্থ হয়ে যাবেন!”
-“তুমি বোধহয় ভুলে গেছো তোমাকে কি শর্ত দেয়া হয়েছে।”হাত ছাড়িয়ে সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে বললো-
-“আমার মা’কে হাত করে আর অন্তুকে পটিয়ে তুমি এ বাড়ীর বউ হয়ে এসেছো।কথাটা মনে রেখো।আর আমার কাছে স্ত্রী’র অধিকার আশা করোনা।আমি তা দিতে পারবোনা।আমার স্ত্রী ঐ একজনই…..!”


রাফিজ বলার আগেই তনুকা ম্লান স্বরে বলে উঠলো!
-“জানি,তানিয়া।আপনার প্রথম স্ত্রী।যে রাগ করে আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে।”
-“সে আমাকে ছেড়ে চলে গেলেও সে আমার গোটা চেতনা জুড়ে রয়েছে।আমরা পরস্পর ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম আর তাই আমাদের মান অভিমানও খুব প্রগাঢ়।একটা ছোট্ট কারনে ও আমাকে ভুল বুঝে চলে যায়।”
-“শুনেছি সে আপনার নামে মামলাও করেছিলো!”
রাফিজ মুখ বেঁকিয়ে হাসলো-“কোনো সন্তানকে তার মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইলে সেই মা তার সন্তান ফিরে পাবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক।তুমি হলেও তাই করতে!এতে দোষের কিছু নেই।”
-“আমি হলে অন্তুকে ছেড়ে যেতে পারতাম না।কোনো মা তা পারেনা!”হঠাৎ মুখ ফসকে বলে ফেললো তনুকা!
রাফিজ তীক্ষ্ম সুরে বললো-“তুমি কি তানিয়ার খামতি বের করে তাকে আমার কাছে ছোট করার চেষ্টা করছো?”
-“নাহ্…মোটেই না…এটা কথার পিঠে কথা প্রসঙ্গে বলেছি।আমাকে মাফ করবেন।আমি আপনার কাছে তানিয়ার জায়গা চাইতে আসিনি।কেবল এতোটুকু বলতে চাই যে,অন্তুর পৃথিবীটা এখনো সাদা।সেখানে পৃথিবীর কাঠিন্যের কোনো ছাপ এখনো পড়েনি।ও এখনো জানেনা যে ওর মা ওকে ছেড়ে চলে গেছে।যখন সে এটা জানবে তখন সে প্রচন্ড ধাক্কা খাবে।তাই আপনাকে শুধু এটুকুই বলতে চাই, অন্তত অন্তুর জন্য হলেও আমাদেরকে সুখী দাম্পত্যের অভিনয় করতে হবে।কারন বাবা-মা’র দাম্পত্য অশান্তি সন্তানের জীবনকে বিষিয়ে তোলে।ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলেমেয়েরা সুন্দর মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারেনা।অন্তু এখনো অবুঝ।ওকে সুন্দর একটা পরিবার উপহার দেয়া আমাদের দায়িত্ব।আমি কখনোই আপনাকে বলবোনা,আমাকে তানিয়ার জায়গাটা দিন।তার জায়গা তার।আমি তো অন্তুর কারনেই…..!”
বলে থেমে গেলো তনুকা!আবার বললো-“আপনাকে এভাবে বিব্রত করার জন্য দুঃখিত।একারনেই বলছিলাম,এভাবে সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরবাড়ী ভরিয়ে না ফেলে বরং আপনি স্বাভাবিক আচরন করুন। আপনার ডিপ্রেশন অন্তুর মধ্যেও স্থানান্তরিত হবে!”
-“এতো লেকচার দেবার দরকার নেই!আমার কি করনীয় তা আমি ভালোই জানি।এখন যাও,সরো এখান থেকে!”রাফিজ সিগারেট এ্যাসট্রেতে গুঁজলো।
তনুকা নিরবে ঘরে চলে এলো।বিছানার একপাশে ছোট্ট অন্তু ঘুমিয়ে আছে।শ্বাশুড়ী ওকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো,তনুকা নিজেই ওকে দেয়নি।
গত কয়েক মাসে অন্তুর সাথে ওর অন্তরঙ্গতা দেখেই ওর শ্বাশুড়ী রেবেকা হক একটা তড়িত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ওর ব্যপারে।মা হারা অন্তুর জন্য তনুকাকেই মা বানিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তাই তনুকার এ বাড়ীতে আসা।
তনুকা অন্তুর অংক টিচার।অন্তু একটা কিন্ডারগার্টেনে সবেমাত্র কেজিতে পড়ছে।ওকে পড়ানোর জন্য রেবেকা হক তনুকাকে ঠিক করেছিলেন।তনুকা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।টিউশনিটা পেয়ে আর মানা করেনি।কলেজের পাশাপাশি সে একটা কিন্ডারগার্টেনে ছোট বাচ্চাদের পড়াতো।সেখান থেকেই অন্তু তনুকার খুব অনুরক্ত হয়ে পড়ে।এমনকি ওর অকারন জেদ কান্না রাগ এসব অন্য কোনো টিচার সামাল দিতে না পারলেও তনুকা অনায়াসেই অন্তুকে সামাল দিতে পারতো।এমনও হয়েছে অন্তুর টিফিনও তনুকাকেই খাইয়ে দিতে হচ্ছে।অন্তু কান্নাকাটি বা জেদ করলে তনুকাই ওকে সামাল দিচ্ছে।
রেবেকা হক তনুকাকে বেশ কিছুদিন ফলো করেছেন।মেয়েটি ধার্মিক মনোভাবাপন্ন।বোরকা পড়ে স্কুলে আসে যায়।ধৈর্য্য সহনশীলতাও খুব বেশী।কিন্ডারগার্টেনের প্রায় প্রতিটি বাচ্চা ‘তনুকা মিস’ বলতে অজ্ঞান।তনুকাও অন্তুকে খুব স্নেহ করে।রেবেকা বুঝতে পারলেন তার মা হারা বাচ্চাটার জন্য তনুকার মতো মেয়েই পারফেক্ট।এটা ভাবার পর থেকেই রেবেকা গোপনে গোপনে তনুকার বাড়ীর খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন।
বাবা নাই ওদের,মা আর দুবোন তনুকারা।বড় বোনের স্বামী মারা গেছে সে এ বাড়ীতেই মায়ের সাথে থাকে।রেবেকা ওর মায়ের সাথে কথা বলে বুঝলেন তনুকা তানিয়ার মতো জেদী আর অহংকারী হবেনা।তখনই তিনি তনুকাকে রাফিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বানানোর পরিকল্পনা পাকা করে ফেললেন।
রাফিজ প্রথমে একেবারেই রাজী ছিলোনা কিন্তু অন্তুর দিকে তাকিয়ে আর মায়ের কঠিন জেদের কাছে হার মেনে রাফিজকে মৌণ সম্মতি দিতে হয়েছে।
তবে তনুকা বিয়ে করে এ বাড়ীতে আসার পরপর আজই রাফিজ ওকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে যে তনুকার অধিকারের হাত শুধু অন্তু পর্যন্তই যেন সীমাবদ্ধ থাকে।কখনো রাফিজকে স্বামী হিসেবে পাবার স্বপ্ন যেন সে না দেখে।
অন্তুর নড়াচড়ায় চমকে উঠে ওর কাছে গিয়ে বসলো তনুকা।ওর পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে দিতেই অন্তু ফের ঘুমিয়ে পড়লো।তনুকা চুপ করে বসেছিলো।
ঘড়ি দেখলো।সকাল হতে এখনো ঘন্টাখানেক বাকী।রাফিজ এখনো বারান্দায়।তনুকা ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে স্যুটকেস থেকে জামা বের করে বাথরুমে ঢুকে গেলো।পোশাক বদলে অযু করে নামাজ আদায় করলো।নামাজের পাটিতে দাঁড়িয়েই টের পেলো রাফিজ ঘরে ঢুকেছে।রাফিজ দুহাত বাড়িয়ে সাজিয়ে রাখা সমস্ত ফুল টেনে ছিড়ে গেটের দিকে ছুঁড়ে মারলো।তনুকা তখনো একমনে নামাজ পড়ে যাচ্ছে।সমস্ত ফুল মাটিতে ফেলে বিছানা পরিস্কার করে তাতে শুয়ে পড়লো রাফিজ।
তনুকা নামাজ শেষ করে সারা ঘরে চোখ বোলালো।পুরো ঘরে যেন ফুলের কার্পেট বিছানো।ঝাড়ুটা খুঁজে নিয়ে সমস্ত ফুল একত্র করে একটা ব্যাগে ভরে রাখলো।কাজ শেষ করে বিছানায় তাকিয়ে দেখলো পিতা পুত্র মহানন্দে ঘুমুচ্ছে বরং তনুকার শোবার মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।
তনুকা অন্তুর অপর পাশ দিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো!
চোখে রোদ পড়তেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো তনুকার।মুখ তুলে দেখলো পিতা পুত্র এখনও নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। বিছানা থেকে নেমে ঘরের বাইরে চলে এলো।শ্বাশুড়ী লনে ফুলগাছে পানি দিচ্ছিলেন।তনুকাকে দেখে হাসলেন-“কি ব্যপার এতো সাত সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলো?”
-“জ্বী মা।আমার এমনিতেও সকাল সকাল ওঠার অভ্যাস।সকালে স্কুলে যেতাম তো…!আচ্ছা, সকালের নাস্তায় সবাই কি খায় আম্মা?আজ আমি নাস্তা বানাই?”
রেবেকা হাসলেন-“আজই দরকার কি!বুয়াকে বলে রেখেছি।ও’ই বানাবে।”
-“না আম্মা।নাস্তাটা আজ আমিই বানাই।পরিবারের সবার খাবার দাবার গৃহিনীর নিজ হাতে করাটাই উচিত।রান্নাবান্নার কাজটা বুয়াদের দিয়ে না করালেই ভালো!”
রেবেকা তনুকার দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন।তার মনে পড়ে গেলো তানিয়ার কথা।সে রান্নাঘরের কাজ করতে একেবারেই পছন্দ করতো না।বেলা দশটার আগে সে ঘুম থেকেই উঠতো না।প্রথম দিকে কিছুদিন রেবেকা করলেও প্রতিদিন পারতেন না।রাফিজ কিছুদিন বাইরে থেকে কিনে এনে খেয়েছে।পরে তানিয়ার কথাতে রান্নাবান্না করার জন্য আলাদা একটা বুয়া রাখতে হয়েছে।তনুকার কথায় রেবেকা সামান্য হেসে বললেন-“সবদিন কি পারবে করতে?”
-“কেন পারবো না মা!এখন তো আর স্কুল নেই!অনায়াসেই করতে পারবো।আপনি শুধু আমাকে কোনটা কোথায় আছে দেখিয়ে দিন!”
নাস্তার টেবিলের দৃশ্যপটই আজ অন্যরকম।সবাই তৃপ্তির সাথে নান্তা করছে।তনুকা নিজেও অন্তুকে পাশে বসিয়ে ওর মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে।রাফিজ আড়চোখে সেটা দেখে চোখ সরিয়ে নিলো।রাফিজের বাবা রুটি সব্জির ভূয়সী প্রশংসা করলেন।রেবেকা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন,যাক তার সিদ্ধান্তটা খারাপ হয়নি।তানিয়া যখন এ বাড়ীর বউ ছিলো তখন কোনোদিন এমন পরিবেশ তৈরী হয়নি।তানিয়া দেখতে খুব সুন্দরী ছিলো বলে ওর মধ্যে আলাদা একটা দাপট কাজ করতো।
মডেলিং করতো বলে প্রায় দিনই যখন তখন এখানে সেখানে চলে যেতো সে।অন্তুর জন্মের পর সে কিছুদিন বাধ্য হয়ে বাসায় ছিলো আর তারপর পরই তানিয়া পুনরায় বাইরের কাজে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
মুটিয়ে যাবে বলে সে অন্তুকে কখনো ব্রেষ্ট ফিড করায়নি।মডেলিং এ সবেমাত্র সে নাম করতে শুরু করেছিলো আর তাতেই তানিয়ার ক্যারিয়ার কনশাসনেস বেড়ে আকাশচুম্বি হয়ে গিয়েছিলো। অন্তুকে পুরোপুরি রেবেকা হকের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলো তখন।ফলে অন্তু ছোটবেলা থেকেই মাতৃহীন একটা জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলো।সে তানিয়ার চেয়ে রেবেকার কাছেই স্বস্তিবোধ করতো বেশী।
এদিকে ধীরে ধীরে তানিয়ার বাইরের দিকে মনোযোগ বেড়ে যাওয়ায় রাফিজের সাথে খুঁটিনাটি নিয়ে তর্ক বাঁধতে শুরু করলো।রাফিজ ঘরোয়া মানসিকতার ছেলে।সে তানিয়াকে ঘরে বেশী দেখতে চাইতো। তাই তানিয়ার বাইরে যাওয়া নিয়ে কিছু একটা বললেই তানিয়া তুলকালাম বাঁধিয়ে দিতো।
ফলে রাফিজ এসব নিয়ে কথা বলাই বন্ধ করে দিলো।সবই একরকম চলছিলো।এর মধ্যে অন্তুকে নার্সারীতে ভর্তি করানো হলো।কিন্তু ঘরে মায়ের যত্ন না পাওয়ায় অন্তু নার্সারী ক্লাসেই রেজাল্ট খারাপ করলো!তখনি রাফিজ ক্ষেপে উঠলো।
এর মধ্যেই একদিন তানিয়াকে নিয়ে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা স্ক্যান্ডাল ছাপলে রাফিজ পুরোপুরি বিগড়ে গেলো।সেই দিনই তুমুল ঝগড়া হলো দুজনের। তানিয়া রাগ করে বাড়ী ছেড়ে চলে গেলো।শুধু তাই না,তার সাতদিন পরেই অন্তুকে চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠালো সে।
রাফিজ সেবার ভালোভাবেই ক্ষেপেছিলো।জবাবে সেও পাল্টা লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে দিলো।পরে ব্যপারটা কোর্ট পর্যন্ত গড়ালো।অবশেষে মামলার রায় রাফিজের পক্ষেই গিয়েছিলো।
এরপর থেকে তানিয়া আর একদিনও যোগাযোগ করেনি।কিন্তু রেবেকা তার অভিজ্ঞতার চোখ দিয়ে অন্তুর মায়ের অভাব এবং একইসাথে রাফিজের সঙ্গিনীর অভাব বুঝতে পেরে তনুকাকেই পছন্দ করে ঘরে আনলেন।


তনুকা ধার্মিক ও ঘরোয়া মেজাজের মেয়ে।সাংসারিক বিষয়ে তার মনোযোগ দেখে রেবেকা গোপনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
তনুকা অল্প কদিনেই সংসার নিজের আয়ত্ত্বে নিয়ে এলো।কেবল রাফিজই ওর সাথে সহজ হতে পারলোনা!হয়তোবা চাইলোনা বলেই পারলোনা।
প্রতিদিন ফজরের নামাজ সেরে তনুকা রাফিজের পছন্দের নাস্তা তৈরী করে। অন্তুকে তৈরী করে স্কুলে পাঠায়।বেশীরভাগ দিন রেবেকাই নিয়ে দিয়ে আসেন, কোনো কোনোদিন অন্তুর দাদাভাইও সাথে নিয়ে যান।তনুকা রাফিজকে বিদায় করে তারপর ঘরের কাজে হাত দেয়।
দেখতে দেখতে তিনটি মাস চলে গেলো।অন্তুদের ফার্ষ্ট টার্ম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো আর অন্তু সে পরীক্ষায় সবাইকে তাক লাগিয়ে ফার্ষ্ট হলো।
রাফিজ শুনে এবার নিজের মধ্যে আনন্দ ধরে রাখতে পারলো না!যদিও ওর চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিলোনা যে সে কতটা খুশি।তবু তনুকাকে এক পর্যায়ে ফিসফিসিয়ে বলেই ফেললো-“থ্যাংকস! “
তনুকা মনে মনে চমকে গিয়ে মুচকি হেসে বললো-“যাজাকাল্লাহ বললে উপকৃত হতাম!”
-“যাজাকাল্লাহ মানে?”
বিয়ের পর এই প্রথম রাফিজ তনুকার সাথে যেচে কথা বললো।তনুকা সুন্দর করে থ্যাংকস এর অসাঢ়তা এবং যাজাকাল্লাহর উপকারীতা বুঝিয়ে বললো।এরপর থেকে রাফিজ মনের ভুলে থ্যাংকস বলে ফেললেও সাথে সাথে শুধরে নিয়ে যাজাকাল্লাহ বলে।
তনুকা হেসে ওঠে।
সেদিন থেকেই দুজনের মাঝে বন্ধুত্বের বীজ রোপিত হলো।আজকাল মাঝে মধ্যেই রাফিজ তনুকার জন্য এটা সেটা নিয়ে আসে।একদিন কি মনে হতে বেলীফুল কিনে নিয়ে আসলো।কিন্তু সরাসরি কখনোই কিছু তনুকাকে দেয়না।আজও একতোড়া রজনীগন্ধা এনে ওয়্যারড্রবের উপর ফেলে রেখেছে কিন্তু কি এক সংকোচে ডেকে দিতে পারছেনা।
তনুকা কি একটা কাজে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘরে এসে ফুলগুলো দেখে খুশি হয়ে বললো-“ওমা,কি সুন্দর!মাশাআল্লাহ!আমার জন্য?”
রাফিজ টেবিলের ওপর পা রেখে পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিলো!গম্ভীর মুখে বললো-
-“উঁহুঁ,বড়া বানিয়ে ভেজে খাওয়ার জন্য এনেছি!”
তনুকা প্রথমে রসিকতাটা ধরতে না পেরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তারপরই ফিক করে হেসে বললো-“ওহ্,বুঝেছি আজ হয়তো তানিয়ার জন্মদিন।আর এটা ওর প্রিয় ফুল ছিলো বলেই কিনে নিয়ে এসেছেন।কি, ঠিক বলেছি?”
অপ্রসঙ্গিকভাবে তানিয়ার প্রসঙ্গ এসে পড়ায় রাফিজ প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে গেলো তারপর আরো বেশী গুরুগম্ভীর স্বরে বললো-
-“হুঁ,এককাঠি বেশী বুঝে ফেলেছো!এবার আমাকে এককাপ চা দিলে কৃতার্থ হই!”
তনুকা দ্রুত ফুলের তোড়াটা হাতে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।মিটসেফের উপর রেখে চটপটে হাতে চা বানালো।একটা তশতরীতে কয়েকটা ডালের বড়া সহ ট্রে তে করে রাফিজের কাছে নিয়ে গেলো!রাফিজ চা নিতে গিয়ে পিরিচে বড়া দেখে জিজ্ঞেস করলো-“এটা আবার কি?”
তনুকা দুষ্টু হেসে বললো-“আপনিই না বললেন,বড়া ভাজার জন্য এনেছেন।তাই কয়েকটা বড়া ভেজে নিয়ে এলাম আপনার জন্য!”
রাফিজ তাকিয়ে রইলো-“ফাজলামি করছো আমার সাথে?”
তনুকা দাঁতে জিভ কেটে বললো-“একদম না।আমার সেই সাহস আছে?এটা ডালের বড়া,আমি কিন্তু একবারো বলিনি যে এটা রজনীগন্ধার বড়া!”
রাফিজ হাত বাড়িয়ে একটা বড়া মুখে তুললো।
তনুকা চলে আসতে নিলে রাফিজ পেছন থেকে ডাকলো-“অন্তু কি করে?”
-“ও আম্মার সাথে খেলা করছে!”
-“আমি একটু নিউমার্কেটে যাবো কিছু জিনিস কিনতে!চাইলে যেতে পারো!”
-“আমি কিন্তু বোরকা পড়ে বাইরে যাই।আপনার অসুবিধা হবে না? “
রাফিজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো-“আম্মাকে বলে তৈরী হয়ে আসো!”
মনের উচ্ছাস চেপে মুখ নামিয়ে ছোট্ট করে বললো তনুকা-“জ্বী!”
নিউমার্কেট পার হয়েও রাফিজের বাইক যখন সামনের দিকে ছুটলো তখন তনুকা অবাক হয়ে বললো-“আপনি না বললেন নিউমার্কেটে যাবেন?”
-“চুপ করে টাইট হয়ে বসো!”রাফিজ বাতাসকে ছাপিয়ে জবাব দিলো!
আধাঘন্টা পর ওরা একটা ক্যাফেশপের পাশে এসে থামলো।তনুকা হোন্ডা থেকে নেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।ওর পরনে নেভী ব্লু আবায়ার সাথে একই রঙের হিজাব।নিকাবে ঢাকা থাকায় ওর চেহারা আরো সুন্দর দেখাচ্ছিলো যেন রাফিজের চোখে।যেন সেলোফেনে মোড়া সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপ।
বাইক দাঁড় করিয়ে রাফিজ হঠাৎ তনুকার হাত ধরে টান দিলে তনুকার ভেতর পর্যন্ত কেঁপে উঠলো।
কোণের একটা টেবিল বেছে নিয়ে বসে পড়লো ওরা। তনুকা দেয়ালের দিকে মুখ করে বসেছে।রাফিজ বললো–“চাইলে নিকাব নামাতে পারো,তোমাকে কেউ দেখতে পাবেনা!”তনুকা নিকাব সামান্য নামালো।রাফিজ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তনুকা লজ্জা পেয়ে কিছুটা গুটিয়ে গেলো!
-“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
-“কিভাবে তাকিয়ে আছি?”
-“আচ্ছা,আমরা এখানে কেন এসেছি?”
রাফিজ বাইকের চাবিটা দিয়ে টেবিলের উপর আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বললো-“তোমাকে কিছু কথা বলার জন্যই এখানে নিয়ে এসেছি!”
-“জ্বী,বলুন!”
-“কিভাবে বলবো!ঠিক বুঝতে পারছিনা!”
-“নিঃসংকোচে বলুন।আমি তো আপনার বন্ধুর মতো!”
-“থ্যাংকস!ওহ্ স্যরি যাজাকাল্লাহ!”
তনুকা নিরবে তাকিয়ে রইলো।মনের গভীরে গোপন আশাগুলো একবার নিঃশব্দে ছুঁয়ে গেলো ওকে,মন বলছে,রাফিজ আজ হয়তো তাকে ভালোবাসি বলবে!তনুকা কি জবাব দেবে ভাবতে লাগলো!
এমন সময় রাফিজ টেবিলের ওপর চোখ রেখে বললো-“তনু….তুমি খুব ভালো একটা মেয়ে!গত কয়েকটা মাসে তুমি আমার জীবন একদম পাল্টে দিয়েছো!আমার অন্তু লেখাপড়ায় ভালো করছে।ও এখন আগের তুলনায় অনেক প্রানবন্ত।আমি সবকিছুর জন্য তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ!”
-“এভাবে বলছেন কেন!ওটা তো আমারও সংসার।যা করেছি নিজের সুখের জন্যই করেছি!”
-“আমি জানি তনু,তুমি খুব ব্রড মাইন্ডের একটা মেয়ে।তাই তোমাকে বলতে আমার দ্বিধা নেই,তুমি আমার খুব ভালো একজন বন্ধু!আমি মুলতঃ তোমাকে যে কথাটা বলার জন্য এখানে নিয়ে এসেছি সেটা বাড়ীতেও বলতে পারতাম কিন্তু এখানকার পরিবেশটা আরো সুন্দর।ভাবলাম তোমাকে নিয়ে ঘুরেও আসা হলো মনের কথাটাও অকপটে বলে ফেলা হলো!”
-“আচ্ছা…বলুন!”তনুকার মুখ মায়াবী হাসিতে ভরে গেলো।রাফিজ হঠাৎ টেবিলের উপর রাখা তনুকার হাতের উপর নিজের হাত রাখলো! দ্বিধাজড়িত কন্ঠে বললো-
-“গত সপ্তাহে তানিয়া ফোন করেছিলো আমাকে… বুঝলে!ও খুবই আপসেট।অসংখ্যবার আমার কাছে ক্ষমা চাইলো।হাউমাউ করে কাঁদলো।” বলে রাফিজ তনুকার দিকে তাকালো।
তনুকার মুখের হাসি স্থির হয়ে গেছে।সে রাফিজের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।রাফিজ কি বলবে সে তা শুনতে চায়!
রাফিজ প্রায় ফিসফিসিয়ে বললো-“তানিয়া আমার কাছে ফিরে আসতে চায় তনু!ওকে আমি কখনোই বিমুখ করতে পারবোনা।ও যদি ফিরে আসে, তুমি মাইন্ড করবে না তো?”রাফিজ উত্তরের আশায় তাকিয়ে রইলো।
তনুকা কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসলো-“দেখুন,তানিয়া আপনার স্ত্রী।আর আপনারাদের ডিভোর্সও হয়নি তাই তানিয়া চাইলে যে কোনো সময়ই ফিরতে পারে।এটা তো মুলতঃ ওরই সংসার।আপনি যেভাবে খুশি হবেন,আমিও সেভাবেই খুশি!” তনুকা মৃদুস্বরে বললো।
রাফিজ শক্ত করে তনুর হাতটা জড়িয়ে ধরলো-“উফ্,তনু!তুমি যে কতটা নিশ্চিন্ত করলে আমাকে বলে বোঝাতে পারবোনা।আম্মা’কে বোঝাতেই বরং বেগ পেতে হবে!তুমি কি হেল্প করবে?”
-“ভাববেন না,আম্মাকে আমিই বুঝিয়ে বলবো!”
ফেরার পথে রাফিজ প্রানখোলা হাসি হাসছিলো।
দুইবার জিজ্ঞেস করলো-“তনু, তুমি কথা বলছো না কেন!মন খারাপ?তুমি ঠিক আছো তো!”
তনু রাফিজের কানের কাছে মুখ রেখে বাতাসকে ছাপিয়ে বলেছে-“আপনি ঠিক থাকলেই আমি ঠিক!”
রেবেকা সব শুনে ভীষণ আপত্তি করলেন।কিন্তু তনুকার উদার মানসিকতার কারনে তার আপত্তি ধোপে টিকলোনা।ঠিক হলো,আগামী কালই তানিয়াকে ফিরিয়ে আনা হবে।রাতে রাফিজ প্রবল উৎসাহে অন্তুকে বললো-“অন্তু সোনা,বলো তো কাল কে আসবে?”
-“জানিনা!”দুদিকে মাথা নেড়ে বললো অন্তু!
রাফিজ ওর গাল টেনে দিয়ে বললো-“তোমার আম্মুসোনা আসবে!”
-“এই যে আম্মু!”তনুকার কোলে শুয়ে বললো অন্তু!রাফিজ বিব্রত হাসলো-
-“তোমার আরেকটা আম্মু আছে!ঐ যে,তুমি কেঁদেছিলে না একদিন আম্মুর জন্য…ভুলে গেছো?”
অন্তু বোকার মতো তাকিয়ে রইলো বাবার দিকে।তনুকা অন্তুকে টেনে শুইয়ে দিয়ে বললো-“আরে মা’কে দেখলে ঠিকই মনে পড়ে যাবে!ও তো ছোটমানুষ,এ্যাতো কি ওর মনে আছে?”
রাফিজ ইতস্তত করে বললো-“ইয়ে তনু,তানিয়া আসলে তো এইরূমে শোবে,তাই না?তাহলে তুত্..তুমি…?”
তনুকা মুচকি হাসলো-“ভাববেন না,আমি অন্তুকে নিয়ে নিচের রুমে চলে যাবো!কোনো সমস্যা নেই!”
রাফিজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো!
পরদিন সকালে রাফিজ নিজে গিয়ে তানিয়াকে নিয়ে এলো।তানিয়া এসেই তনুকাকে আপাদমস্তক জরিপ করতে লাগলো।রেবেকা কোনো কথা না বলে উঠে ভেতরে চলে গেলেন।
রাফিজ তনুকাকে বললো-
-“পরিচয় করিয়ে দেই…ও হচ্ছে….!”
-“উনি তানিয়া…..অন্তুর মা!আমি চিনতে পেরেছি!”হেসে বললো তনুকা।
পরক্ষণেই তানিয়ার ধমক খেয়ে চমকে তাকালো-
-“এ্যাই,মেয়ে,তুমি আমার নাম ধরে ডাকছো কেন?আমি বয়সে এবং সম্পর্কে তোমার সিনিয়র হবো!আমাকে তানিয়া আপু বলবে!”
-“স্যরি,তানিয়া আপু!”
-“ওকে..!আমার রুম কোনটা?”
-“তোমার রুম তোমারই আছে তানিয়া!”রাফিজ বললো।
-“এ্যাই মেয়ে,আমাকে এক কাপ চা দিতে বলো তো !”
-“আমার নাম তনুকা।আপনি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হোন, আমিই চা বানিয়ে আনছি!”
দশ মিনিটের মাথায় চা আর হালকা নাস্তাসহ ট্রে হাতে তনুকা উপরে উঠে এলো!ভেতরে ঢোকার আগে দরোজায় নক করতেই রাফিজ ডাকলো-“এসো তনুকা!”
তনুকা ট্রে রেখেই বেরিয়ে যাচ্ছিলো।তানিয়া ডাকলো-“এ্যাই শোনো,তুমি কি এই রূমে ঘুমাতে?”
-“জ্বী!”
-“এখন কোথায় শোবে তুমি?”
-“অন্তুকে নিয়ে নিচের রুমে!”
তনুকা কিছুটা ভয়ে ভয়ে বললো কারন ওর ধারনা ছিলো তানিয়া হয়তো এসেই অন্তুকে ওর কাছ থেকে কেড়ে নেবে।কিন্তু তেমনটা হলোনা।অন্তুই মায়ের কাছে গেলোনা।ভয়ে সেঁটে রইলো তনুকার কোলে।
তানিয়া মুখ বেঁকিয়ে বললো-“দাদীর মতো স্বার্থপর হয়েছে!যাও ওকে তোমার কাছেই রাখো!”
প্রতিদিনের মতোই তনুকা ভোরে উঠে নামাজ পড়ে সবার জন্য নাস্তা বানিয়ে ফেলে।সবার নাস্তা খাওয়া হয়ে গেলে তানিয়া দেরী করে বসলেও তনুকা ওকে গরম গরম রুটি সব্জিই খেতে দেয়।
তানিয়ার বাইরের ব্যস্ততা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে!তবুও সে নিজের রূপচর্চার ব্যপারে খুবই সতর্ক থাকে,নিয়মিত ডায়েটিং করে আর জিমে যায়।
এতোকিছুর মাঝেও তনুকা নিজের মতো করে সবকিছু করে যেতে লাগলো কেবল উপরে রাফিজের রুমে যাওয়াটাই সে কমিয়ে দিয়েছে।রাফিজ না ডাকলে তনুকা পারতপক্ষে সেখানে যায়ই না।
একদিন তনুকা অন্তুকে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ওর পাশে শুয়ে পড়েছিলো।এমন সময় ওর হাতে টান লাগায় ঘুমটা ছুটে গেলো!তাকিয়ে দেখলো রাফিজ একটা প্যাকেট হাতে ওকে ওঠার জন্য টানছে। তনুকা উঠে বসতেই রাফিজ ওর হাতে প্যাকেটটা দিয়ে বললো-“খুলে দ্যাখো!”
তনু স্মিতহাস্যে সেটা খুলে খুব খুশি হলো-একটা পলিতে কিছু ফুচকা আর টকপানি রয়েছে।
তনুকা হেসে বললো-“মমম…যাজ
াকাল্লাহ।”
রাফিজ পকেট থেকে একগাদা বেলী ফুল তনুকার হাতে দিয়ে বললো-“আজ মালা পাইনি!”
-“তানিয়া আপুর জন্য আনেননি?”
-“তোমার তানিয়া আপু এসব ফুচকা টুচকা খায়না।ওরে খাওয়াইতে হলে চাইনীজে নিতে হবে!”
তনু খুশিতে মৃদু হেসে রাফিজের গালে টুপ করে একটা চুমু খেয়েই লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেললো।
রাফিজ অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উঠে গেলো।অমনি তানিয়ার মুখোমুখি পড়ে গেলো সে!তানিয়া তীক্ষ্ম শব্দে বলে উঠলো-“আমি ওপরের বারান্দা থেকে তোমাকে আরো দশ মিনিট আগে বাড়ীতে ঢুকতে দেখলাম আর তুমি এখনো এখানে।কি করছো এতক্ষণ ধরে?”
তনুকার হাতে ধরা ফুল আর ফুচকার প্যাকেট দেখে তানিয়া হিসহিসিয়ে বলে উঠলো-“তোমার মা তো আমার বিরাট উপকার করেছে দেখছি।আমি বাড়ী ছাড়তে না ছাড়তেই আমার একটা সতীন জুটিয়ে দিয়েছে। আর তুমিও তো সেই মায়েরই ছেলে।ব্যাস,খাতির লাগিয়ে দিয়েছো!তোমাদের পুরুষদের এই ছোঁক ছোঁক স্বভাব আর গেলোনা!”
-“বুঝে সমঝে কথা বলো তানিয়া,তনুকা আমার স্ত্রী।এ বাড়ীতে তোমার যতটুকু অধিকার ততটুকু তনুকারও অধিকার!”রাফিজ বললো।
-“মানি না, মানিনা আমি তোমার এই বিয়ে।আমি তোমার দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছি নইলে তোমার নামে নালিশ করলে তোমার জেল জরিমানা হয়ে যাবে!প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তুমি দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহন করেছো।বের করে দাও ওকে।ও আমার স্বামী,সংসার সন্তান সব নিজের করে ফেলেছে।”
-“তানিয়া তুমি এসব কি উল্টা পাল্টা বকা আরম্ভ করেছো?”
-“আমি ঠিকই বলেছি,কেন ও সবসময় তোমার আশেপাশে ঘুরঘুর করে,তোমাকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে চায়,আমি কি কিছু বুঝিনা মনে করেছো?ওকে বের করো নতুবা আমি বেরিয়ে যাবো, এই বলে দিলাম!”
চিৎকার চ্যাঁচামেটিতে তনুকা হতভম্ব হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো।গোলমাল শুনে রেবেকা বেরিয়ে এলেন।তানিয়া নিজের রুমে ছুটে গিয়ে দরোজা লাগিয়ে দিলো।রাফিজ ওর পেছনে পেছনে গেলো।রেবেকা তনুকাকে ঘরে চলে যেতে ইশারা করতেই তনুকা ঘরে চলে গেলো!
পরের কয়েকদিন নিরবে নিরুপদ্রবেই কাটলো।
এর পর একদিন তনুকা নিজের ঘরে বসে রাফিজের শার্টের বোতাম সেলাই করছিলো।তখনি তানিয়া ঢুকলো।বাঁকা হাসি দিয়ে বললো-“আদর্শ স্ত্রী….হুঁহ্…!”
তনুকা কোনো জবাব দিলোনা।তানিয়া বলে যেতে লাগলো-“তোমার দেনমোহরানা কত?”
-“কেন?”
-“কারন আমি জানতে চাচ্ছি!”
-“এটা আমার আর রাফিজের মধ্যকার বিষয়।আপনি কেন জানতে চাইবেন?”
-“আমি তোমাকে তোমার মোহরানা দিয়ে দেবো।আরো কিছু বেশীও দেবো।তুমি এই বাড়ী ছেড়ে চলে যাবে।কবে যাবে বলো?”সরাসরি বলে বসলো তানিয়া।
তনুকা বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
তানিয়া বলে চললো-
-“তোমার কারনে আজ আমার সংসার আমার নেই,আমার সন্তান আমার নেই আর গবেট একটা স্বামী আছে সে আমার পাশে শুয়েও তোমার গল্প করে।আমার সব থেকেও কিছুই আমার নেই।তুমি কবে ছাড়বে এ বাড়ী বলো!”
-“আপনার কথায় আমি কেন বাড়ী ছাড়বো!এটা তো আমারও সংসার!”


-“এটা শুধু আমার সংসার।রাফিজ আমার স্বামী অন্তু আমার ছেলে।তুমি উড়ে এসে জুড়ে বসেছো।আর প্রতিনিয়ত প্রমান করতে চাচ্ছো যে তুমি কত সৎ পরিশ্রমী আর উপকারী একজন।তোমার এসব চালাকী আমি বেশ বুঝি!আমার সাথে এসব চালাকি করে পার পাবেনা,বুঝেছো?”
-“ওনার কথা ছাড়া আমি কোথাও যাবো না!”
-“তুমি যদি না যাও তাহলে আমার অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করার কারনে ওর নামে আমি মামলা করবো।ওকে জেলে ঢোকাবো।ওর সবকিছু আমি তছনছ করে ফেলবো।এখন তুমিই বলো,তুমি কি ওর জীবনটা ধ্বংস করে ফেলতে চাও?”
তনুকা কেঁদে ফেললো-“আমি অন্তুকে ছাড়া থাকতে পারবোনা!”
-“এসব মায়াকান্না আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই!অন্তু আমার পেট থেকে বেরিয়েছে কাজেই মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী দেখাবেনা। আমিই ওর মা! কাল থেকে তোমাকে আমি এ বাড়ীর ত্রিসীমানায় দেখতে চাইনা!”বলে চলে গেল তানিয়া।
তানিয়া চলে যাবার পর তনুকা নিজের ভেতর এক অস্থিরতা বোধ করলো কিন্তু কোনো উপায় দেখতে পেলোনা।রাফিজ তার প্রতি কৃতজ্ঞ কিন্তু ভালো সে শুধু তানিয়াকেই বাসে!আর অন্তুর মা’ও সেই। তাই তনুকাকেই এখন সিদ্ধান্ত যা নেয়ার নিতে হবে।

পরদিন সকালে রাফিজ নাস্তার টেবিলে তনুকাকে না পেয়ে বারকয়েক ডাকলো।
–তনুউ…..!তনুউ….!”
কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে সোজা মায়ের রুমে গেলো।সেখানে রেবেকা অন্তুকে নিয়ে চোখ বুঁজে পড়ে আছে।
রাফিজ অবাক হয়ে বললো-মা….তনুক
া কোথায়?আর আমার নাস্তার কি হলো?”
রেবেকা শান্ত কন্ঠে বললেন-“তানিয়াকে বল্ তোর নাস্তা দিতে!”
-“তানিয়াকে কেন?তনুকা কোথায়?”
-“তনুকা চলে গেছে!”
-“চলে গেছে মানে?কোথায়?
-“তানিয়া ওকে বের করে দিয়েছে!”
-“কেন?”
-“সেটা তানিয়াকেই জিজ্ঞেস কর।”
হতভম্ব রাফিজ সোজা নিজের রুমে গেলো!
তানিয়া তখনো ঘুমে।রাফিজ ওকে ধাক্কা দিয়ে ডেকে তুললো-“তনুকা কে কি বলেছো?”
-“কেন,সে কৈফিয়ত কি তোমাকে দিতে হবে?”
-“ওকে চলে যেতে বলেছো কেন?”
-“কারন এটা আমার সংসার!আর তুমি কি এসব ফালতু কথা জিজ্ঞেস করার জন্যই আমার ঘুমটা ভাঙ্গালে?”
-“তনুকা নিজের মতো করে ছিলো, তাতেও কি তোমার সমস্যা?”
-“আমি আমার সংসারে কোনো জঞ্জাল চাইনা!”
-“তনুকা মোটেও জঞ্জাল না।ও আমার বউ।আমি আজই গিয়ে ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো।”
-“তাই নাকি? তাহলে আমাকে আমার বাবার বাড়ীতে রেখে এসো!”
রাফিজ একথায় একেবারে চুপ মেরে গেলো।
কয়েকদিনের মধ্যেই রাফিজের মনে হলো ওর জীবনের সকল আনন্দ নিরানন্দে পরিণত হয়েছে।
গত কয়েক মাসের সুশৃংখল জীবনযাপনের সেই সুখস্মৃতি কাঁটার মতো বিঁধছে।
সব থেকেও কি যেন নেই।
ওদিকে অন্তু স্কুলের সময়টুকু বাদে সারাক্ষণ মন খারাপ করে দাদীর ঘরে পরে থাকে!রাফিজ নিজেও নিজের ভেতরের অস্থিরতাটা ধীরে ধীরে টের পাচ্ছে।জীবনের আনন্দগুলো যেন হারিয়ে গেছে।
তনুকার অভাবটা বুকে তীরের আঘাতের মতো বাজছে যেটা তানিয়া চলে যাবার পর কখনো হয়নি।
অনেক ভেবে চিন্তে রাফিজ তানিয়ার সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলো!
অবেলায় গোসল করে আসরের নামাজ সেরে তনুকা বিছানায় গা এলিয়ে পড়েছিলো।ওর মা এসে দুবার ডেকে গেছেন।তনুকা দুপুরের খাবারও খায়নি!ওর কিছুই ভালো লাগেনা আজকাল।ক’টা দিন হয়ে গেলো,অন্তুকে দেখেনা।কে জানে বাচ্চাটা কেমন আছে।তনুকার বুকটা হু হু করে উঠলো।চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুজল!
আচমকা দরজায় শব্দ হতেই তনুকা দ্রুত চোখ মুছে উঠে ভেতর ঘরে চলে গেলো।তনুকার বড় বোনটা এসে দরজা খুলেই খুশিতে চিৎকার করে উঠলো-“তনুউরে…
……দেখ কে এসেছে!”
বলে রেবেকাকে সমাদর করে ভেতরে এনে বসালো অনু। ওর চিৎকার শুনে তনুকার মা’ও বেরিয়ে এলেন।এদিকে অন্তুকে কোলে নিয়ে ভেতরে ছুট দিলো তনুর বড় বোন।
তনুকাকে দেখে ওর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেঁদে দিলো অন্তু।তনুকা অন্তুর মুখে গালে চোখে এলোপাতাড়ী চুমু খেতে লাগলো।
-“অন্তু সোনা…মানিক আমার!” বলছে আর ওর দুচোখেও ঝরছে শ্রাবনের বারিধারা।
আচমকা ঘরে রাফিজকে ঢুকতে দেখে থমকে গেলো সে।রাফিজ এসে অন্তুকে তনুকার কোল থেকে নামিয়ে বললো-“তুমি দাদুর কাছে যেয়ে বসো আব্বু।”
অন্তু বাধ্য ছেলের মতো চলে গেলো।
তনুকা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।রাফিজ এগিয়ে এসে দুহাতে ধরে ওকে কাছে টানলো-“ছেলেকে তো এলোপাতাড়ী চুমো খেলে,ছেলের বাপের জন্য কোনো আবেগ অবশিষ্ট নেই!”
তনুকা কোনো কথা বললোনা।মুখ নামিয়ে রাখলো।রাফিজ হঠাৎ ওকে শক্ত করে নিজের সাথে চেপে ধরলো।বললো-“তুমি এতো নিষ্ঠুর কিভাবে হতে পারলে!আমাকে না জানিয়েই চলে এলে?”
-“আমি থাকলে যে আপনার ক্ষতি হতো!”
-“তুমি না থাকায় আমি আরো বেশী ক্ষতির মধ্যে পড়েছি!”
-“তানিয়া আপা….!”
তনুকা কিছু বলতে নিলে রাফিজ ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো-“তানিয়া তোমাকে ভয় দেখিয়েছে কারন তার সাথে সমস্যা জটিল হবার পরেই তোমার আমার বিয়েটা হয়।আর সে তখন ফিরে আসতে চায়নি।তবু আমি তার ফিরে আসার পথ খোলা রেখেছি।এই ক্লেইমে মামলা দাঁড়াতোই না।তবু সে চান্স নিয়েছে!”
তনুকা নিরবে শুনলো কথাগুলো।রাফিজ তনুকার নাকে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো-
–“এখন সে তার জায়গামতো চলে গেছে।আসলে ওকে ফিরিয়ে আনাটাই ছিলো আমার সবচে বড় ভুল,সংসার সন্তানের মায়া যাকে বাঁধতে পারেনা তার কাছে ভালোবাসা ছেলেখেলা।তবে ওকে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে না আনলে আমার মনের ভেতর ওর প্রতি মোহটা রয়ে যেতো!তুমি চলে আসার পর বুঝেছি,তুমি আমার জীবনে কি ছিলে!অন্তু সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকতো।এরমধ্যে তানিয়া নতুন একটা অফার পেয়েছে। সেটা নিতে চাইলে আমি সোজা মানা করে দেই,বলেছি আমার সংসার করতে হলে এসব ছাড়তে হবে!আমি ভালো করেই জানতাম ও সংসার ছাড়বে বাট ক্যারিয়ার ছাড়বে না! ব্যাস্,এতেই বেঁধে গেলো তুলকালাম কান্ড।অবশেষে এবার ঠান্ডামাথায় ওর সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে এসেছি।গতকালই ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়েছি আমি।আর এবার মিউচুয়ালি ডিভোর্স হয়েছে আমাদের।আসলে, তনু…আমি তোমাকে এই ক’টা দিন হারিয়ে মনে মনে অনেকবার খুঁজেছি! তোমাকে না হারালে বুঝতেই পারতাম না,তুমি আমার হৃদয়ের কতখানি জুড়ে আছো।তুমি ছাড়া আমি একদম অসম্পূর্ণ।আর এই কদিনে বুঝলাম তোমাকে ছাড়া আমার চলবেনা।”
তনুকা কিছু বলার আগেই টের পেলো রাফিজের গরম নিঃশ্বাস ওর নাকের নিচের দিকে যাচ্ছে।লজ্জায় দ্রুত সে রাফিজের কাঁধে মুখ লুকালো।ওর কানের কাছে মূখ রেখে রাফিজ বললো-“চলো, বাসায় চলো।আমার সংসার তোমার অপেক্ষার প্রহর গুনছে!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close